সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন কাঠামোয় বাড়তি বেতন রোববার, অনেকের বেতন নির্ধারণে জটিলতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 Min Read
ছবি: সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক: নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চার মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ করতে না পারায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে নতুন কাঠামোর বেতন পাচ্ছেন না। তাঁদের আপাতত পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া হতে পারে। বর্ধিত বেতনের বকেয়া পরে পরিশোধের কথা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করা হলেও ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত অনেক সমস্যার সমাধান হয়নি।

অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী ও ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা নতুন কাঠামোর আওতায় আসার কথা। তবে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা থাকায় সংশ্লিষ্টদের একাংশ এখনো কাজ শেষ করতে পারেননি।

বেতন নির্ধারণে গ্রেডভিত্তিক অসংগতি

নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে গ্রেডের ক্রম, জ্যেষ্ঠতা এবং উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা নিয়ে অসংগতি দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তুলনায় জুনিয়র কর্মকর্তা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন। আবার পদোন্নতির পরও কারও কারও মোট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগের পক্ষ থেকে এসব সমস্যা সমাধানের আবেদন করা হয়েছে। তবে ১ নভেম্বরের আগে সব সমস্যার নিষ্পত্তি করা কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ৫ অক্টোবর থেকে বেতন নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু হলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এখনো এ কাজ শেষ হয়নি। বেতন নির্ধারণের নিয়ম প্রয়োগ, উচ্চতর গ্রেড এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে জটিলতার পাশাপাশি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যার কথা জানিয়েছেন কর্মচারীরা।

১১তম ও ১২তম গ্রেডের বেতনে উল্টো চিত্র

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামোয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিচের গ্রেডের কর্মচারী বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন। এতে গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাতীয় বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৭০০ টাকা এগিয়ে রয়েছেন।

কিন্তু পুরোনো কাঠামোয় সর্বশেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের সঙ্গে নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতন সমন্বয় করতে গিয়ে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন কর্মচারীরা।

তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। পুরোনো কাঠামোয় প্রারম্ভিক মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে তাঁর বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তাঁর নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর পুরোনো কাঠামোয় মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। প্রারম্ভিক মূল বেতন ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে তাঁর বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোর ২৪ হাজার ৩০০ টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তাঁর মূল বেতন নির্ধারিত হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।

ফলে হিসাবটি সঠিক হলে, ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ৩৭ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা হবে। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারী নতুন কাঠামোয় ৭০০ টাকা কম মূল বেতন পাবেন।

পর্যায়ক্রমে বেতন বাড়লেও ব্যবধানের আশঙ্কা

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার ক্ষেত্রেও গ্রেডভিত্তিক বেতনের ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

তাঁদের হিসাব অনুসারে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। এতে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন।

একইভাবে, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। এ ক্ষেত্রে ব্যবধান হবে ৫৮০ টাকা।

আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা হবে বলে তাঁদের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন ব্যবধান দাঁড়াবে ৮০০ টাকা।

কর্মচারীদের অভিযোগ, নতুন প্রজ্ঞাপনের বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি পর্যালোচনা করে এসব অসংগতি দূর করা প্রয়োজন। তবে উল্লিখিত হিসাব ও বেতন নির্ধারণের ধাপগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধান অনুযায়ী যাচাই করা জরুরি।

পদোন্নতির পর কমতে পারে মোট আয়

নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হার পরিবর্তনের কারণেও কিছু কর্মচারীর মোট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কর্মচারীদের দেওয়া একটি উদাহরণ অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতন পেলে ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা পান ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে নবম গ্রেডে তাঁর মূল বেতন ৫১ হাজার টাকা হলে ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা দাঁড়ায় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা।

এ ক্ষেত্রে মূল বেতন বাড়ছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। বিপরীতে বাড়িভাড়া ভাতা কমছে ১ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতার সম্মিলিত অঙ্ক ৬০০ টাকা কমে যাচ্ছে।

কর্মচারীদের আশঙ্কা, বাড়িভাড়া ভাতার হার ও মূল বেতন সমন্বয়ের নিয়ম যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করলে অন্যান্য গ্রেডেও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

উচ্চতর গ্রেড ও জ্যেষ্ঠতা নিয়েও আপত্তি

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা এবং সময় নির্ধারণের নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকে।

তাঁদের অভিযোগ, চাকরির মেয়াদ ও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়ের হিসাব সঠিকভাবে সমন্বয় করা না হলে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের বেতন সমান হয়ে যেতে পারে। এমনকি বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তার মূল বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

কর্মচারীদের মতে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা, চাকরির মেয়াদ গণনা এবং বেতন নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট করা হলে এ ধরনের অসংগতি কমানো সম্ভব হবে।

আইবাস++ জটিলতায় আটকে বেতন নির্ধারণ

বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়ার পেছনে আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতাকেও দায়ী করছেন কর্মচারীরা। তাঁদের অভিযোগ, নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণে অভিজ্ঞ জনবলের পর্যাপ্ত ব্যবহার না হওয়ায় কাজটি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আইবাস++ সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। সরকারি বাজেট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল প্রস্তুত, অর্থ পরিশোধ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত জটিলতা দূর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা। তাঁদের দাবি, গ্রেডভিত্তিক বেতনের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।

তবে নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে উত্থাপিত সব অভিযোগের বিষয়ে অর্থ বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং সংশোধিত নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোকে কর্মচারীদের দাবি বা হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

Share This Article
Leave a Comment