নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের জ্বালানি সংকট নিরসনসহ সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দুই বছরে অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে অর্থনীতি পূর্ণমাত্রায় ঘুরে দাঁড়াবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন আশ্বাস দিয়ে জনগণকে ভুল প্রত্যাশা দেওয়া উচিত নয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ এখন শুধু আলাদা কোনো খাত নয়; বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর পাশাপাশি আগের সময়ের বিপুল দেনা ও বিভিন্ন আর্থিক দায়ও সামলাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতীতের সমস্যা নিয়ে অজুহাত দেখানোর পরিবর্তে সরকার সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে চায়। তবে বিদ্যমান ঘাটতির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতির জটিলতা বেড়েছে।
ব্যবসার খরচ কমানো সরকারের চ্যালেঞ্জ
দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেশি এবং ব্যবসা সহজ করার পরিবেশ দুর্বল বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণনির্ভর ব্যবস্থায় চলার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি পৃথক সংস্থায় বিভক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর একটি নীতিমালা প্রণয়ন করবে, অন্যটি সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত কাজ হয়নি। এখন এ খাতে অনুসন্ধান জোরদার করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) দিয়ে ৫০টি নতুন কূপ খননের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র—উভয় অঞ্চলেই গ্যাস অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার অন্তত ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সৌরবিদ্যুতের অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের করছাড়ও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যাংক ও পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা
ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের কারণে এ দুটি খাত গুরুতর সংকটে পড়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশ থেকে প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক সংকেত মিলছে। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে অতিরিক্ত সাত বিলিয়ন ডলারের চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সম্প্রতি নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওয়াল স্ট্রিটের ১৬ জন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
আলোচনায় জ্বালানি ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু জিওং, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ম. তামিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। আলোচনা সঞ্চালনা করেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি রূপালী চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।
দৈনিক উত্তর দিগন্ত

