ধর্ম ডেস্ক:সময় মানুষের জীবনের অমূল্য সম্পদ। ইসলামে সময়ের গুরুত্ব, ইবাদতের শৃঙ্খলা, দায়িত্ব পালন এবং কাজের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে সময়ের শপথ, দিন-রাতের তাৎপর্য এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার শিক্ষা পাওয়া যায়।
সুরা আসরে সময়ের গুরুত্ব ও সফলতার পথ
পবিত্র কোরআনের ১০৩তম সুরা আসর সময়ের শপথ দিয়ে শুরু হয়েছে। এই সুরার তিনটি আয়াতে মানুষের জীবনের ক্ষতি থেকে মুক্তি এবং সফলতা অর্জনের কয়েকটি মৌলিক শর্ত তুলে ধরা হয়েছে।
সুরা আসরের অর্থ অনুযায়ী, সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে, তারা এর ব্যতিক্রম।
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, মানুষের জীবনে সফলতা শুধু সময় পার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই সময়কে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঈমান, সৎকর্ম, সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে মানুষ তার জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।
তাফসির ইবনে কাসিরে ‘আসর’ শব্দের ব্যাখ্যায় সময়ের এমন একটি ব্যাপক অর্থের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যখন মানুষের বিভিন্ন কাজ সংঘটিত হয়। এসব কাজ ভালো কিংবা মন্দ—দুই ধরনেরই হতে পারে। অন্য একটি ব্যাখ্যায় আসর বলতে দিনের শেষভাগ বা সন্ধ্যাকালকে বোঝানো হয়েছে।
তাফসিরে মানুষের ক্ষতিকে লোকসান ও ধ্বংসের অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সত্যের উপদেশ দেওয়ার বিষয়টিকে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে।
ইমাম শাফেয়ির নামে প্রচলিত একটি বক্তব্যেও সুরা আসরের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। এই সুরা মানুষকে অল্প কথায় জীবনের উদ্দেশ্য, দায়িত্ব এবং সফলতার পথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
দিন ও রাতের শপথে সময়ের তাৎপর্য
পবিত্র কোরআনের আরও কয়েকটি সুরার শুরুতে দিনের বিশেষ সময় কিংবা রাতের শপথ করা হয়েছে। এসব আয়াত মানুষকে প্রকৃতির পরিবর্তন, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন এবং সময়ের গুরুত্ব নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে।
সুরা ফজর
সুরা ফজরের প্রথম আয়াতে ভোরবেলার শপথ করা হয়েছে। পরের আয়াতে শপথ করা হয়েছে দশ রাতের। এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় ভোর এবং নির্দিষ্ট রাতের তাৎপর্য নিয়ে মুফাসসিররা আলোচনা করেছেন।
সুরা লাইল
সুরা লাইলে রাতের শপথ করা হয়েছে, যখন তা পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে। পাশাপাশি দিনের শপথ করা হয়েছে, যখন তা আলোকিত হয়ে প্রকাশিত হয়। রাত ও দিনের এই পরিবর্তন মানুষের চিন্তা, কাজ এবং জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সুরা দুহা
সুরা দুহার শুরুতে পূর্বাহ্নের উজ্জ্বল আলোর শপথ করা হয়েছে। এরপর রাতের শপথ এসেছে, যখন তা নিস্তব্ধতা ও অন্ধকারে ঢেকে যায়। এই সুরার পরবর্তী আয়াতগুলোতে মহানবী (সা.)-কে সান্ত্বনা দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
বছর ও সময়ের হিসাব জানতে রাত-দিনের ভূমিকা
পবিত্র কোরআনে রাত ও দিনকে শুধু প্রাকৃতিক পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি; বরং এগুলোকে মানুষের জন্য আল্লাহর নিদর্শন এবং সময় গণনার মাধ্যম হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
সুরা ইসরার ১২ নম্বর আয়াতে রাত ও দিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আয়াতটির অর্থ অনুযায়ী, রাত ও দিনকে দুটি নিদর্শন করা হয়েছে, যাতে মানুষ তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পারে এবং বছরের সংখ্যা ও সময়ের হিসাব জানতে পারে।
সুরা ইউনুসের ৫ নম্বর আয়াতেও সূর্য ও চাঁদের কথা উল্লেখ করে সময় গণনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ সূর্যকে উজ্জ্বল এবং চাঁদকে আলোকময় করেছেন। চাঁদের বিভিন্ন মনজিল নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে মানুষ বছরের সংখ্যা ও সময়ের হিসাব জানতে পারে।
অন্যদিকে, সুরা নাবার ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে রাতকে বিশ্রাম ও আবরণের মতো এবং দিনকে জীবিকা অর্জনের সময় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সুরা ফুরকানের ৬২ নম্বর আয়াতে রাত ও দিনের ধারাবাহিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায় এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এই পরিবর্তনে চিন্তার বিষয় রয়েছে।
এসব আয়াত থেকে সময়ের হিসাব রাখা, বিশ্রাম নেওয়া, জীবিকা অর্জন এবং আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।
নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ
ইসলামে সময়ের শৃঙ্খলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্ধারিত সময়ে ইবাদত করা। পবিত্র কোরআনে নামাজের সময় ও দিনের বিভিন্ন পর্বের সঙ্গে ইবাদতের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরা নিসার ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মুমিনদের ওপর নামাজ নির্ধারিত সময়ে আদায় করা ফরজ করা হয়েছে।
সুরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েম করার নির্দেশ এসেছে।
সুরা ইসরার ৭৮ নম্বর আয়াতে সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করার কথা বলা হয়েছে। একই আয়াতে ফজরের তিলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরা ত্বহার ১৩০ নম্বর আয়াতে ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি সূর্যোদয়ের আগে, সূর্যাস্তের আগে এবং রাত ও দিনের বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আয়াতগুলোতে ইবাদতের সঙ্গে সময়ের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্দিষ্ট সময় ও বিধান বিস্তারিতভাবে বুঝতে সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা এবং হাদিসের আলোকে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
কাজ, বিশ্রাম ও দায়িত্ব পালনের মধ্যে ভারসাম্য
পবিত্র কোরআন মানুষের জীবনে ইবাদতের পাশাপাশি জীবিকা অর্জন ও অন্যান্য দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
সুরা জুমার ৯ নম্বর আয়াতে জুমার নামাজের আজান দেওয়া হলে আল্লাহর স্মরণের দিকে এগিয়ে যেতে এবং বেচাকেনা ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। পরের আয়াতে নামাজ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করার কথাও বলা হয়েছে।
এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের সময়কে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জন করাও মানুষের দায়িত্বের অংশ।
সুরা ইনশিরাহর ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যখন একটি কাজ থেকে অবসর পাওয়া যায়, তখন অন্য কাজে মনোনিবেশ করতে। আয়াতটির তাফসিরে ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গসহ বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সাধারণভাবে আয়াতটি মানুষকে অবসরকে অর্থবহ কাজে ব্যয় করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আল্লাহর ওপর ভরসা
সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে পরামর্শ করার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আয়াতটির প্রেক্ষাপটে মহানবী (সা.)-কে সম্বোধন করে পরামর্শের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর ওপর নির্ভর করার কথাও বলা হয়েছে।
এই শিক্ষা থেকে মানুষ তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পরামর্শ নেওয়া, বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে।
কোরআনের শিক্ষা থেকে সময় ব্যবস্থাপনার বার্তা
পবিত্র কোরআনের এসব আয়াতের আলোকে সময়ের সঠিক ব্যবহারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—
- ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে জীবনকে অর্থবহ করা।
- সত্য ও ধৈর্যের চর্চা করা এবং অন্যকেও ভালো কাজে উৎসাহিত করা।
- নির্ধারিত সময়ে নামাজ ও অন্যান্য দায়িত্ব পালন করা।
- জীবিকা অর্জন, বিশ্রাম ও ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
- অবসর সময়কে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা।
- পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
সব মিলিয়ে, পবিত্র কোরআনের শিক্ষা মানুষকে সময়ের মূল্য উপলব্ধি করতে এবং জীবনের দায়িত্বগুলো সচেতনভাবে পালন করতে উৎসাহিত করে। সময়কে শুধু ব্যস্ততার মধ্যে কাটিয়ে দেওয়া নয়, বরং ঈ

