ডেস্ক নিউজ
পঞ্চগড় সদর উপজেলায় পরকীয়ার জেরে স্বামী আলম হককে (৩০) বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্ত্রী মৌসুমী আক্তারের (২৫) বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মৌসুমী আক্তারকে আটক করেছে পুলিশ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের শিংরোড প্রধানপাড়া এলাকা থেকে তাকে আটক করে পঞ্চগড় সদর থানার পুলিশ।
নিহত আলম হক ওই এলাকার তসলিম উদ্দীনের ছেলে। প্রায় নয় বছর আগে মৌসুমীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সাত বছর বয়সী একটি মেয়ে ও পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার রাতে স্বামী আলম হককে ভাত খেতে দেন মৌসুমী। খাওয়ার পর তাঁরা ঘুমাতে যান। কিছুক্ষণ পর আলম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁর পেটে ব্যথা শুরু হয় এবং তিনি বমি করতে থাকেন।
বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে চিনি শরবত খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। এ সময় মৌসুমী শরবতের সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ মিশিয়ে আলমকে খাওয়ান বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে রংপুর যাওয়ার পথে দেবীগঞ্জ এলাকায় পৌঁছালে আলমের মৃত্যু হয়।
পরে রাতে তাঁর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হলে খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। রোববার সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পঞ্চগড় সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরে নিজ এলাকায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই জাকির হোসেন থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা করেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ঘটনার একদিন পর সোমবার দুপুরে মৌসুমীকে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। পরে আলমের ভাগনে মকছেদুলের কাছে তিনি ঘটনার বিষয়ে কিছু তথ্য দেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
পরিবারের দাবি, মৌসুমী জানিয়েছেন, একই এলাকার বাবুল হোসেন (৩৪) নামের এক ব্যক্তির দেওয়া ওষুধই তিনি আলমকে খাওয়ান। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে জড়ো হন এবং পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে মৌসুমীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
পুলিশের কাছে মৌসুমী ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবার। তাঁর দাবি, বাবুল প্রায় এক বছর ধরে তাঁকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত করতেন। মোবাইল ফোন, ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে দেখা করার জন্য চাপ দিতেন। স্বামীকে খাওয়ানোর জন্য বাবুল তাঁকে ওষুধ দিয়েছিলেন এবং সেটিকে ঘুমের ওষুধ বলে জানিয়েছিলেন।
মৌসুমীর ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখানোয় তিনি স্বামীকে ওই ওষুধ খাওয়ান।
নিহত আলমের বড় ভাই আব্দুল করিম বলেন, তাঁরা বিষয়টি জানতে মৌসুমীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। প্রথমে তিনি কিছু স্বীকার করেননি। পরে পরিবারের এক ভাগনের কাছে বাবুলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা জানান। তাঁদের দাবি, বাবুল ও মৌসুমী পরস্পরের পরামর্শে আলমকে খাবার ও শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়েছেন।
আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার ভাইকে এভাবে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে—এটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোখলেছুর রহমান বলেন, আলমের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রোববার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছিল। সোমবার স্থানীয় ব্যক্তিরা পুলিশকে জানান, নিহতের স্ত্রী ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
ওসি বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মৌসুমী আক্তারকে আটক করে থানায় নিয়ে এসেছে। নিহতের ছোট ভাইয়ের করা অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়া হবে। এরপর মৌসুমীকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার সকালে আদালতে পাঠানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় বাবুল হোসেন নামে আরেকজন অভিযুক্ত রয়েছেন। তাঁকে আটকের জন্য পুলিশের অভিযান চলছে।’
ঘটনাটির প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের পর আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

