নিউজ ডেস্ক : রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীমকে (২৪) গাড়িচাপা দিয়ে মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে আসামিপক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে। এ বিষয়ে একটি আপসনামায় নিহতের পরিবারের সদস্যরা স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে আসামির জামিন বা খালাসের বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদিরের আদালতে মামলার আসামিদের হাজির করা হয়। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন আদালতকে আপসের বিষয়টি জানান।
আইনজীবী বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে। ইতোমধ্যে ওই অর্থ নিহতের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হয়েছে। আপসনামায় স্বাক্ষর করে তারা আসামির জামিন কিংবা খালাসের বিষয়ে কোনো আপত্তি না থাকার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, নিহত মেহেদী বাক্প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি শুনতেও পারতেন না এবং কথা বলতে পারতেন না। দুর্ঘটনার পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে আর কোনো অভিযোগ না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর মা-বাবা বয়স্ক হওয়ায় তাঁদের দেখভালের বিষয়টি বিবেচনা করে মধ্যস্থতার মাধ্যমে ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, আপসটি শান্তা মরিয়ম নামের একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আইনজীবী এবং নিহতের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের সম্মতিতেই আপসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পরিবারকে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা চাপ দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, তাদের ওপর কোনো চাপ দেওয়া হয়নি। নিহতের পরিবার ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করেছে। এমনকি তারা ময়নাতদন্ত করাতেও আগ্রহী ছিলেন না এবং মামলা করতে চাননি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে দুর্ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে বলে জানান আইনজীবী।
‘একটি জীবনের মূল্য কি ৯ লাখ টাকা হতে পারে’—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, নিহত ব্যক্তি প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং বাদীপক্ষ নিজেরাই আপস করতে চেয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরে ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা হয় বলে জানান তিনি।
যেভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনা
গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর বারিধারা ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম। এ সময় একটি নীল রঙের প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাঁকে ধাক্কা দেয়। গাড়ির নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার পর গাড়ির ডান পাশের চালকের আসন থেকে কালো টি-শার্ট ও হালকা ধূসর ট্রাউজার পরা কিশোর আজান আলী শরীফকে বের হয়ে আসতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। গাড়ির অন্য পাশ দিয়ে বের হন আকাশ মারক। তিনি আজানের বাবা আব্বাস আলী শরীফের গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন।
ঘটনার পর পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন আজানকে আটক করে পুলিশের কাছে তুলে দেন। পরে তাঁকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় আকাশ মারককে আসামি করা হলেও প্রথম দিকে আজানের নাম ছিল না।
এরপর দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সামনে আসে। সেখানে গাড়ির চালকের পাশের দরজা দিয়ে আজানকে বের হতে দেখা যায়। এরপর তাঁকে মামলায় আসামি করা হয়নি কেন—এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
পরে বুধবার সন্ধ্যায় আজানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলায় নাম থাকা আকাশ মারক এখনো পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজান আলী শরীফ গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা বাংলাদেশ বিমানের পাইলট আব্বাস আলী শরীফ। দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত প্রোটন এস৭০ গাড়িটি আব্বাস আলী শরীফের স্ত্রী সিগমা আব্বাসের নামে নিবন্ধিত।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, দুর্ঘটনার পর নিহতের ভাই মোক্তাদীর ঘটনাস্থলে এলে আজানের পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আজানকে মামলায় না জড়িয়ে গাড়িচালককে আসামি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও সূত্রটি দাবি করে। পরে আকাশ মারককে একমাত্র আসামি করে মামলা করা হয়।
এদিকে কেন আজানকে শুরুতে মামলায় আসামি করা হয়নি, তা জানতে নিহতের ভাই মোক্তাদীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর ফোন বন্ধ রাখার পেছনে পরিবারের চাপ ছিল বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে নিহতের পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আজানের বাবা আব্বাস আলী শরীফ ও মা সিগমা আব্বাসের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে আব্বাস আলী শরীফ তাঁর এক ভাইকে থানায় পাঠিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নেন বলে জানা যায়।
পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হলে পুলিশ আজানকে গ্রেপ্তার করে।
এখন নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকার আপসনামার বিষয়টি আদালতে জানানো হয়েছে। মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এগোবে।

