হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধে ফের ভাঙন, লোকালয়ে ঢুকছে পানি
নিজস্ব প্রতিবেদক
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। দেড় মাসের ব্যবধানে একই স্থানে দ্বিতীয়বার বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নদীতীরবর্তী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভাঙন দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এতে কালীগঞ্জসহ আশপাশের ১০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
রোববার বিকেল পর্যন্ত পানিতে শত শত একর জমির ধান ও সবজি তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সড়কের দুই পাশে আটকা পড়েছে বেশ কিছু যানবাহন। অনেক যাত্রীকে ঝুঁকি নিয়ে কোমরসমান পানি পার হতে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ভারতের ত্রিপুরার চাকমাঘাট ব্যারাজ খুলে দেওয়ার কারণে রোববার ভোর থেকে খোয়াই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। দুপুরে চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে কালীগঞ্জ এলাকায় বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর তীব্র স্রোতে পানি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
হঠাৎ করে পানি প্রবেশ করায় নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশু অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
এদিকে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে সড়কের বড় একটি অংশ প্লাবিত হয়ে যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
এর আগে গত ৯ জুলাই রাতে একই স্থানে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। তখন খোয়াই নদীর পানি উপচে সদর উপজেলার প্রায় ৩০টি গ্রামে ঢুকে পড়ে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রথম দফায় ভাঙনের পর বাঁধ মেরামতের কাজে দীর্ঘসূত্রতা ছিল। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় বাঁধের দুর্বল অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যায়। এর মধ্যেই নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় ওই অংশ আবার ভেঙে গেছে বলে তাঁদের দাবি।
কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মখলিছ মিয়া বলেন, ‘আগেরবার বাঁধ ভাঙার পর আমরা আশা করেছিলাম স্থায়ীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু মেরামতের কাজ যেভাবে হয়েছে, তাতে আবার ভাঙনের আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটিই হলো। এখন চোখের সামনে দিয়ে পানি ঢুকছে।’
তিনি বলেন, বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাজারো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। এর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাঁধ মেরামতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সুঘর এলাকার বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, বাঁধ মেরামতের সময় কাজের গতি ছিল ধীর। স্থানীয়ভাবে কাজ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল। তাঁর ভাষ্য, বাঁধটি স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হলে এত অল্প সময়ের মধ্যে একই জায়গায় দ্বিতীয়বার ভাঙন দেখা দিত না।
আফজাল হোসেন আরও বলেন, আগের ভাঙনে এলাকার বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকেরা আবার আমনসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি চাষ করেছিলেন। এবার সেগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকেরা নতুন করে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
একই এলাকার বাসিন্দা বিকাশ সূত্রধর বলেন, ‘পানি যেভাবে ঢুকছে, তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগে নদীর পানি তিন জায়গায় ভেঙে বের হয়েছিল। এবার এক জায়গা দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতি আগের চেয়েও বেশি হতে পারে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ভারতের ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চাকমাঘাট ব্যারাজ খুলে দেওয়া হয়। এতে খোয়াই নদীতে হঠাৎ পানি বেড়ে যায় এবং বাঁধের দুর্বল অংশটি ভেঙে যায়।
সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা খুবই মর্মাহত। তবে ব্যারাজ বন্ধ করে দেওয়ায় বিকেল থেকে নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। আশা করছি, দ্রুত পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে আসবে।’
বাঁধের মেরামত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভাঙনকবলিত অংশের মেরামতকাজে সময় লেগেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত ওই অংশ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

