নীলফামারী প্রতিনিধি: গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা হাডুডু। সময়ের সঙ্গে আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যম জনপ্রিয় হলেও ডিমলার মানুষের কাছে এখনো এ খেলার আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। হাডুডুর জমজমাট আসরকে কেন্দ্র করে নীলফামারীর ডিমলায় জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী হাজারো মানুষ। খেলোয়াড়দের দাপুটে লড়াই, কৌশল ও ক্ষিপ্রতায় মাঠে যেমন তৈরি হয় উত্তেজনা, তেমনি খেলা ঘিরে বসা গ্রামীণ মেলায় সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়নের পূর্ণারঝার ফুটব্রিজসংলগ্ন মাঠে স্থানীয় পূর্ণারঝার যুব সমাজের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় হাডুডু টুর্নামেন্ট। এ আয়োজনকে ঘিরে দুপুরের পর থেকেই মাঠ ও আশপাশের এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
টুর্নামেন্টে মোট আটটি দল অংশ নেয়। কয়েক ধাপের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে ফাইনালে ওঠে কাঁকড়া একাদশ, ঝুনাগাছ চাপানি ও স্বাগতিক পূর্ণারঝার একাদশ, খালিশা চাপানি। ফাইনাল ম্যাচে শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত ২৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে জয় নিশ্চিত করে স্বাগতিক পূর্ণারঝার একাদশ। প্রতিপক্ষ কাঁকড়া একাদশ পায় ১৪ পয়েন্ট। ম্যাচে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন বিজয়ী দলের টাইগার সেলিম।
খেলা মাঠে যতটা উত্তেজনা ছড়িয়েছে, মাঠের বাইরে ততটাই জমে উঠেছে গ্রামীণ মেলা। ফুটব্রিজসংলগ্ন এলাকায় বসে বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান। বুট, বাদাম, চানাচুর, জিলাপি, মিষ্টিসহ নানা ধরনের খাবারের পসরা নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। খেলাকে কেন্দ্র করে আসা দর্শকদের ভিড়ে এসব দোকানেও ছিল বেশ বেচাকেনা। শিশুদের ছোটাছুটি, কিশোরদের আড্ডা আর নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা ফিরে পায় গ্রামবাংলার পুরোনো উৎসবের আবহ।
খেলা শেষে অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খালিশা চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মঈনুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিমলা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক কাজী হাবিবুর রহমান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন খালিশা চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামান সরকার, সাবেক চেয়ারম্যান সামছুল হক হুদা, খালিশা চাপানি ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি মো. ওবায়দুর রহমান, ডিমলা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আয়েশা সিদ্দিকা, ইউপি সদস্য সেলিমুর রহমান, গোল্ডেন এডুকেয়ার হোম স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান, ইউপি সদস্য সামিউল ইসলাম শিমুল, সমাজসেবক তালিমুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আতাউর রহমান আসিক, সমাজসেবক ওহায়দুর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
দর্শকদের মধ্যে এ আয়োজন নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। মাঠের চারপাশে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে দর্শকেরা উপভোগ করেন খেলোয়াড়দের প্রতিটি আক্রমণ ও প্রতিরোধ। নারী দর্শকদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেক দর্শক বলেন, গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা হাডুডুর মতো খেলাগুলো নিয়মিত আয়োজন করা হলে একদিকে যেমন মানুষের বিনোদনের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও দেশীয় খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হবে।
উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের খলিলুর রহমান বলেন, ‘একসময় গ্রামের মাঠে হাডুডু খেলা ছিল অন্যতম প্রধান বিনোদন। এখন প্রযুক্তির যুগে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়েছে। তাই পুরোনো খেলাগুলো ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি প্রয়োজন।’
বাঘেরপুল গ্রামের গৃহবধূ বিলকিস আক্তার বলেন, ‘খেলাটি আয়োজনকে কেন্দ্র করে গ্রামের তরুণদের মধ্যে বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি ও অনুশীলন চলছিল। তাদের মধ্যে যে উৎসাহ দেখেছি, তা সত্যিই ভালো লেগেছে। এমন আয়োজন গ্রামের মানুষের মধ্যে আনন্দ ফিরিয়ে আনে।’
স্থানীয় বাসিন্দা জুলহাস হুসেন বলেন, ‘তরুণদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত রাখা গেলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো থাকবে। পাশাপাশি মাদক ও নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড থেকেও দূরে থাকবে। হাডুডুর মতো ঐতিহ্যবাহী খেলার আয়োজন প্রতিবছর হওয়া উচিত।’
আয়োজক কমিটির সদস্য আনারুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় হাডুডু খেলার আয়োজন হতো। মাঠ, খোলা জায়গা কিংবা গ্রামের রাস্তার পাশে মানুষ দল বেঁধে এ খেলা উপভোগ করত। সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। স্থানীয় তরুণদের সম্পৃক্ত করে পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।’
প্রধান অতিথি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. মঈনুল হক বলেন, ‘আধুনিক বিনোদনের চাপে আমাদের অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা হারিয়ে যাচ্ছে। হাডুডুর মতো দেশীয় খেলাকে টিকিয়ে রাখতে এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করব।’
স্থানীয়দের মতে, হাডুডু কেবল মাঠের প্রতিযোগিতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধন। একটি খেলাকে ঘিরে একই সঙ্গে শিশু, তরুণ, নারী ও প্রবীণদের এক জায়গায় মিলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই নিয়মিতভাবে এমন আয়োজন করা গেলে একদিকে যেমন দেশীয় ক্রীড়া সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মও পাবে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ। ফলে হারিয়ে যেতে বসা হাডুডু আবারও গ্রামবাংলার মাঠে তার পুরোনো জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে পারে।
ডিমলায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলার লড়াই ঘিরে হাজারো দর্শকের মিলনমেলা
Leave a Comment
Leave a Comment

