নিজস্ব প্রতিবেদক: ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দেওয়ায় কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে ভোটে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাঁর ভাষায়, ‘নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’
তিনি বলেন, বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁদের কর্মসূচি চলছে। শুক্রবার সংসদ ভবনের সামনে কর্মসূচি এবং শনিবার ১১টি দলের অংশগ্রহণে লংমার্চ হয়েছে। সামনে সাংগঠনিক কর্মসূচি আরও বাড়ানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
ইসি সূত্রে জানা যায়, দেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছিলেন, ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোট হতে পারে। এরপর দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
ইউপি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিল ইসি। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।
তবে ইসি কমিশনারের ওই বক্তব্যের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিছুই জানে না। এ বিষয়ে ইসির সঙ্গে সরকারের কোনো চিঠি চালাচালি বা আলোচনা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বাজেট, প্রস্তুতি সভা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন থাকায় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। কিন্তু এবার এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি বলে তাঁর দাবি।
এরপর ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, ইউপি নির্বাচনের যে সময়সূচি বলা হয়েছিল, সেটি ছিল প্রাথমিক ও সম্ভাব্য পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারের কার্যক্রম নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতীয় ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসি স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের মতামত গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই পক্ষের সমন্বয়ের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।
এনসিপি অবশ্য নির্বাচন পরিচালনায় সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন এবং কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। দলটির নেতারা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনা মোতায়েনের কথাও বলেছেন।
বৈঠকেও চূড়ান্ত হয়নি ভোটের তারিখ
ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন ভবনে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। বৈঠকে ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ভোট শুরুর আগের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
ইসি জানিয়েছে, এইচএসসি পরীক্ষা, পবিত্র রমজান ও নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়গুলো বিবেচনা করে ভোটের সময়সূচি চূড়ান্ত করতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন।
বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আগামী বছরের ৬ জুন এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে অংশ নেওয়া সবাই পরীক্ষার আগেই নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
তবে ভোট শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
আগের ঘোষিত সম্ভাব্য সময়সূচি থেকে ইসি সরে আসছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মোটেও না।’ তাঁর ব্যাখ্যা, আগের সময়সূচি প্রাক্-প্রস্তুতির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল এবং ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর তা চূড়ান্ত করার কথা আগেই বলা হয়েছিল।
বৈঠকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ইউপি নির্বাচনের চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি।

