ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে গ্রেপ্তার প্রায় ১ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চলমান বিক্ষোভে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দিনের অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাতে প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। মার্সেই শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বোর্দো শহরে সড়ক অবরোধের চেষ্টাও করেন কয়েকজন বিক্ষোভকারী।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। কয়েকটি শহরে বিশেষ বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়।

প্যারিসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

রাজধানী প্যারিসে ইতালির ফটক থেকে ভাঁসেনের ফটক পর্যন্ত একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষ পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে।

একপর্যায়ে কয়েকজন বিক্ষোভকারী অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করেন। এ সময় মুখোশ পরা কয়েকজন তরুণকে একটি গাড়ির শোরুমের জানালা ভাঙতেও দেখা যায়। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। সংঘর্ষে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও জানান মন্ত্রী। তাঁদের একজন তুলুজে এবং অন্যজন ক্লেরমঁ-ফেরাঁ শহরে আহত হন।

নুনেজের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিলের পেছনের অংশে কয়েক হাজার উগ্রপন্থি জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে দাঙ্গাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

ম্যাক্রোঁ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

চলতি সপ্তাহের শুরুতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নির্দেশ দেন, কেবল স্বীকৃত শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভই অনুমোদন করা হবে। একই সঙ্গে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর কথা জানানো হয়।

প্যারিসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জেলি নামের এক নারী বলেন, মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশাই তাঁদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। ম্যাক্রোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাঁরা নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

২৬ বছর বয়সী ওই বিক্ষোভকারী বলেন, মানুষের ওপর করের চাপ বাড়ছে, অথচ নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ সীমিত। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই তাঁরা এবার রাস্তায় নেমেছেন বলে জানান তিনি।

ইউরোপের অন্য শহরেও বিক্ষোভ

ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ও উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে।

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হাজারো মানুষকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে দাঙ্গা দমনকারী পুলিশ। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

উত্তর ইতালির মিলানে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পুলিশ ও শত শত সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়। গত সপ্তাহে সেখানে বিক্ষোভকারীদের একাংশ অগ্নিসংযোগ, জানালা ভাঙচুর ও দোকানে লুটপাট চালিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত দুই হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন ইউরো বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত পুলিশের একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারী হাত হারিয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে রাতভর কারফিউ জারি করা হয় বলেও জানানো হয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপ বাড়াচ্ছে। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা চলমান পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ও তাঁর মন্ত্রীদের দায়ী করছেন।

জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, করের চাপ, শিক্ষা খাতের সমস্যা এবং সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও জনমনে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Share This Article
Leave a Comment