আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি রয়েছে, বেকারত্বের হারও তুলনামূলক কম। শেয়ারবাজারের অবস্থানও বেশ শক্তিশালী। তবু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে অসন্তোষ কমছে না সাধারণ মানুষের মধ্যে। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই বৈপরীত্যই বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য।
অর্থনীতির সামগ্রিক সূচক ইতিবাচক হলেও মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ কমেনি। বাজারে পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্থনীতি সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করছে। ফলে অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরেও ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে পারছে না ট্রাম্প প্রশাসন।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে দ্রুত দ্রব্যমূল্য কমাবেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় অর্থনীতি পরিচালনায় তাঁর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোটারদের একটি অংশ।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও স্বস্তি নেই সাধারণ মানুষের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থনীতির এই সূচকগুলো বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত না দিলেও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কাটেনি।
ট্রাম্প প্রশাসন শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারের ইতিবাচক অবস্থাকে নিজেদের নীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। প্রেসিডেন্টের সমর্থকেরাও এসব পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে অর্থনীতির অগ্রগতির কথা বলছেন।
ট্রাম্পের সহযোগী ও অর্থনৈতিক ভাষ্যকার ল্যারি কুডলো বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর যুক্তি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি প্রশাসনের সাফল্যের প্রমাণ।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির চিত্র ভিন্ন। তাঁদের কাছে প্রবৃদ্ধির হার কিংবা শেয়ারবাজারের উত্থানের চেয়ে সুপারমার্কেটে পণ্যের দাম, পেট্রলের খরচ এবং মাস শেষে বিল পরিশোধের সক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মজুরি বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের অন্যতম কারণ আয় ও পণ্যের দামের মধ্যে ব্যবধান। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে ৩ শতাংশ। একই সময়ে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
এর অর্থ, আয় বাড়লেও সেই বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় বেশি বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের উপলব্ধির পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদেরা যখন বলেন মূল্যস্ফীতি কমেছে, তখন সাধারণত বোঝানো হয়—আগের তুলনায় দাম বাড়ার হার কমেছে। কিন্তু ভোক্তারা অনেক সময় এর অর্থ করেন, পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে।
প্রবীণ ডেমোক্র্যাটিক জরিপকারী সেলিন্ডা লেকের মতে, অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অর্থনীতির পরিসংখ্যান ইতিবাচক হলেও বাজারে গিয়ে বেশি দাম দেওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষকে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
শুল্কনীতি ও ইরান সংঘাতের প্রভাব
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মতো ট্রাম্পও মূল্যস্ফীতি নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। তবে দুই প্রশাসনের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বাইডেনের আমলে করোনা মহামারির পর সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নসহ বিভিন্ন কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যনীতি, শুল্ক আরোপ এবং ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি আমদানিনির্ভর পণ্যের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রলসহ বিভিন্ন পণ্যের খরচে।
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ পিটার মরিসির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কারণ কাজ করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে ঘোষিত ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়েছে। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একটি গবেষণার বরাত দিয়ে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব শুল্কের কারণে ভোক্তা পণ্যের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।
পরবর্তী সময়ে কিছু শুল্ক স্থগিত করা, নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারে আইনি বাধার কারণে সম্ভাব্য প্রভাব কিছুটা সীমিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। তেলের দাম বাড়লে পেট্রলের খরচ বৃদ্ধি পায়, যা পরিবহন ব্যয় ও পারিবারিক বাজেটের ওপরও প্রভাব ফেলে।
চাপ সামলাতে নতুন পদক্ষেপের চিন্তা
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন কর হ্রাস, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপত্রের ওষুধের খরচ কমানোর উদ্যোগকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে।
এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারে সীমা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন ট্রাম্প। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকদের ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার একটি ধারণাও আলোচনায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে কতটা স্বস্তি আসবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নীতির বাস্তবায়ন, অর্থায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কী প্রভাব পড়তে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা মূল্যস্ফীতির চাপকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সমালোচনায় কাজে লাগাতে পারে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ইতিবাচক পরিসংখ্যান তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে।
তবে অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি সব সময় ভোটারদের সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা দেয় না। মানুষের আয় বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে অর্থনীতির সুফল তাঁদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনমতের মধ্যে যে ব্যবধান দেখা গিয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনও এখন একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধান কমাতে তিনি কতটা সফল হন, তার ওপর মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
সূত্র : বিবিসি

