ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত হারিকেনের আলো। রাতের নীরবতা ভেঙে শোনা যেত ঢেঁকিতে ধান ভাঙার শব্দ। মেঠোপথে ছুটে চলত গরুর গাড়ি। কোনো বাড়ির উঠানে দেখা মিলত পালকির। কৃষকের মাথায় থাকত খড়ের তৈরি মাথাল, আর গ্রামের মানুষ মাছ ধরতে ব্যবহার করতেন নানা ধরনের দেশীয় উপকরণ।
সময়ের পরিবর্তনে গ্রামবাংলার সেই চেনা দৃশ্যগুলো এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এসব উপকরণ এখন কেবল বইয়ের ছবি কিংবা গল্পের বিষয়।
তবে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালান্দর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফজলে এলাহী মুকুট চৌধুরীর বাড়ির বৈঠকখানায় গেলে মনে হবে, সময় যেন থমকে আছে। সেখানে সাজানো রয়েছে গ্রামবাংলার অতীত দিনের নানা স্মৃতিচিহ্ন। একটি সাধারণ বৈঠকখানাকে তিনি রূপ দিয়েছেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালায়।
এখানে রয়েছে ঢেঁকি, পুরোনো লণ্ঠন ও হারিকেন। আছে পালকি, গরুর গাড়ি ও ঘোড়ার গাড়ির পুরোনো চাকা। মাছ ধরার দেশীয় উপকরণ জালেঙ্গা, ডেরি ও পলইয়ের পাশাপাশি রয়েছে কৃষকের মাথায় ব্যবহৃত খড়ের তৈরি মাথাল। প্রতিটি উপকরণ যেন নীরবে তুলে ধরছে গ্রামবাংলার একেকটি সময়, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির গল্প।
শখ থেকে সংগ্রহশালা
প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে শখের বশে পুরোনো দিনের এসব উপকরণ সংগ্রহ শুরু করেন ফজলে এলাহী মুকুট চৌধুরী। স্থানীয় মানুষের বাড়ি, চিলেকোঠা ও অব্যবহৃত বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা জিনিস খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করেন তিনি। পরে সেগুলো পরিষ্কার করে নিজের বাড়ির বৈঠকখানায় সযত্নে সাজিয়ে রাখেন।
একসময় যেসব জিনিস গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল, সেগুলোই এখন তাঁর সংগ্রহশালার প্রধান আকর্ষণ। পুরোনো দিনের এসব উপকরণ দেখতে বাড়িতে আসেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের কাছে সংগ্রহশালাটি হয়ে উঠেছে অতীতের গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে জানার একটি ব্যতিক্রমী জায়গা।
মুকুট চৌধুরীর এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে গ্রামবাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার ভাবনা। তাঁর বিশ্বাস, একটি প্রজন্ম যদি নিজের অতীত সম্পর্কে না জানে, তাহলে একসময় নিজের শেকড়ের সঙ্গেও তার দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
হারিকেন, ঢেঁকি আর পালকির গল্প
সংগ্রহশালায় রাখা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামীণ জীবনের নানা স্মৃতি।
একসময় বিদ্যুৎবিহীন গ্রামের রাত আলোকিত করত হারিকেন ও লণ্ঠন। সন্ধ্যার পর ঘরের কাজ, পড়াশোনা কিংবা পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসে সময় কাটানোর সঙ্গী ছিল এসব আলো। এখন বৈদ্যুতিক বাতি ও আধুনিক আলোর ব্যবস্থায় হারিকেনের ব্যবহার কমে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না, সেই মৃদু আলোয় কেমন করে কাটত গ্রামের রাত।
ঢেঁকি ছিল গ্রামীণ পরিবারের পরিচিত একটি উপকরণ। ধান ভানা, চাল তৈরি কিংবা বিভিন্ন খাদ্যশস্য প্রক্রিয়াজাত করার কাজে এর ব্যবহার ছিল। ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ একসময় গ্রামের পরিচিত পরিবেশের অংশ ছিল। এখন আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারে সেই শব্দ অনেক জায়গা থেকেই হারিয়ে গেছে।
একইভাবে পালকি ছিল একসময় মানুষের যাতায়াতের অন্যতম বাহন। বিশেষ করে বিয়েসহ নানা সামাজিক আয়োজনে পালকির ব্যবহার গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। গরুর গাড়ি ছিল কৃষিনির্ভর জনপদের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মাঠ থেকে ফসল আনা কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মালামাল নেওয়ার কাজে গরুর গাড়ির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
মুকুট চৌধুরীর সংগ্রহে থাকা এসব উপকরণ তাই শুধু পুরোনো দিনের বস্তু নয়; এগুলো গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনেরও স্মারক।
কৃষকের জীবন ও গ্রামীণ সংস্কৃতির স্মৃতি
সংগ্রহশালায় রয়েছে মাছ ধরার বিভিন্ন দেশীয় উপকরণ। জালেঙ্গা, ডেরি ও পলইয়ের মতো সরঞ্জাম একসময় গ্রামীণ জলাশয় ও নদীনির্ভর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। স্থানীয় পরিবেশ ও প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ এসব উপকরণ ব্যবহার করতেন মাছ ধরার কাজে।
কৃষকের মাথায় ব্যবহৃত খড়ের তৈরি মাথালও রয়েছে সংগ্রহে। রোদ-বৃষ্টি থেকে মাথা রক্ষায় মাঠে কাজ করা কৃষকদের কাছে এ ধরনের উপকরণ ছিল পরিচিত সঙ্গী। কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও শ্রমের সঙ্গে এসব জিনিসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রতিটি উপকরণ যেন মনে করিয়ে দেয়, আধুনিকতার আগেও মানুষের জীবন ছিল নানা কৌশল, অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও মানুষ নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে তৈরি করেছিলেন নানা উপকরণ। সেই উপকরণগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁদের জীবনসংগ্রাম, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির পরিচয়।
নতুন প্রজন্মের সামনে অতীতের দরজা
বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে গ্রামীণ জীবনের অনেক পুরোনো উপকরণের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমেছে।
মুকুট চৌধুরীর বৈঠকখানার এই সংগ্রহশালা সেই দূরত্ব কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এখানে এসে শিক্ষার্থীরা বইয়ে পড়া কিংবা পরিবারের বড়দের কাছে শোনা বিভিন্ন উপকরণ সরাসরি দেখতে পারছে।
একজন শিক্ষার্থীর ভাষায়, বইয়ে পড়া জিনিসগুলো এখানে এসে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে মনে হয়েছে, যেন পুরোনো দিনের গ্রামবাংলায় ফিরে গেছে সে।
শিক্ষার্থীদের এমন অভিজ্ঞতা সংগ্রহশালাটির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে বাস্তব উপকরণ দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে। একটি পুরোনো হারিকেন কিংবা ঢেঁকি দেখে শিক্ষার্থীরা শুধু একটি বস্তু সম্পর্কে জানে না, বরং সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও ধারণা পায়।
স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক পুরোনো উপকরণ এখনো বিভিন্ন বাড়িতে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে সেগুলোর অনেক কিছুই একসময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ফজলে এলাহী মুকুট চৌধুরী স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে এসব উপকরণ সংগ্রহ করে নিজের বৈঠকখানায় সাজিয়ে রাখার মাধ্যমে সেগুলোকে নতুন করে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন। তাঁর উদ্যোগে অবহেলায় পড়ে থাকা অনেক পুরোনো জিনিস পেয়েছে নতুন পরিচয়।
তবে এ ধরনের সংগ্রহশালাকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা, উপকরণগুলোর পরিচিতি ও ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে দেখার ব্যবস্থা। প্রতিটি উপকরণের নাম, ব্যবহার, সংগ্রহের স্থান ও ইতিহাস লিখে রাখা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য জানার ঠিকানা করার স্বপ্ন
মুকুট চৌধুরীর স্বপ্ন, তাঁর বাড়ির এই ছোট্ট সংগ্রহশালা একদিন শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে গ্রামবাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার একটি ঠিকানা হয়ে উঠবে।
এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী, গবেষক, সংস্কৃতিপ্রেমী ও সাধারণ দর্শনার্থীরা গ্রামীণ জীবনযাত্রার নানা দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন। স্থানীয়ভাবে হারিয়ে যেতে বসা উপকরণগুলোও সংরক্ষণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে।
আধুনিকতার স্রোতে গ্রামবাংলার জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে, বদলে যাবে মানুষের ব্যবহার্য উপকরণও। কিন্তু অতীতের স্মৃতিচিহ্নগুলো যত্ন করে ধরে রাখা গেলে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারবে তাদের পূর্বপুরুষদের জীবন কেমন ছিল, কীভাবে তাঁরা কাজ করতেন, কীভাবে চলতেন এবং কীভাবে গড়ে উঠেছিল তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি।
ঠাকুরগাঁওয়ের সালান্দরের এই বৈঠকখানা তাই কেবল পুরোনো জিনিসের সংগ্রহ নয়। এটি গ্রামবাংলার স্মৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়কে ধরে রাখার একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ।
হারিকেনের মৃদু আলো, ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ, পালকির যাত্রা কিংবা গরুর গাড়ির চাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই দিনগুলো হয়তো আর আগের মতো ফিরে আসবে না। কিন্তু সেসব স্মৃতিচিহ্নকে সযত্নে সংরক্ষণ করা গেলে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র অটুট থাকবে।
কারণ পুরোনো উপকরণগুলো শুধু স্মৃতি নয়—এগুলো আমাদের শেকড়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের পরিচয়।

