মির্জা ফখরুলের আসনে উপনির্বাচন, মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 Min Read
মির্জা ফয়সাল আমিন, শামারুহ মির্জা, দেলেওয়ার হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

দৈনিক উত্তর দিগন্ত ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বও পান তিনি। এবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের সম্ভাবনার কারণে তাঁর সংসদ সদস্য পদে উপনির্বাচন হওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। আর সেই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে হবেন পরবর্তী সংসদ সদস্য—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনের ১৮৫টি কেন্দ্রের ফল অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছিলেন ২ লাখ ২৮ হাজার ৭৫ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৪ ভোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খাদেমুল ইসলাম ‘হাতপাখা’ প্রতীকে পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৮৯২ ভোট।

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার আলোচনা সামনে আসার পর থেকেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের পরিবারের সদস্যদের নাম যেমন আলোচনায় রয়েছে, তেমনি জামায়াতের প্রার্থী হিসেবেও আবারও আলোচনায় এসেছেন দেলাওয়ার হোসেন।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ভোটারদের একটি বড় অংশ রয়েছে। তবে অতীতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাও এ আসন থেকে জয় পেয়েছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থনও নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি স্থানীয়ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বা ‘ভিআইপি’ আসন হিসেবে পরিচিত। এ আসন থেকে নির্বাচিত একাধিক সংসদ সদস্য পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপিতে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা

উপনির্বাচন নিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও থেকে রাষ্ট্রপতি হলে স্বাভাবিকভাবেই এ আসনে উপনির্বাচন হবে। দল যাঁকে যোগ্য মনে করবে, তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে এবং দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাই তাঁর পক্ষে কাজ করবেন।

তবে তিনি জানান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জাকে এ আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে মির্জা ফয়সাল আমিনের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা মহিলা দলের সভাপতি ফুরাতুন নাহার প্যারিস বলেন, আসনটি বিএনপি ধরে রাখতে চাইলে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। ভোটারদের কাছে যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তাঁকে প্রার্থী করা হলে বিএনপির জয় সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

তাঁর মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জা এ আসনের জন্য একজন যোগ্য প্রার্থী হতে পারেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রেজুও মনে করেন, বিএনপি যদি গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থী দিতে পারে, তাহলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে দলটির জয় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মির্জা ফখরুলের নির্বাচনী প্রচারে উন্নয়নের যেসব অঙ্গীকার ছিল, তার কিছু বাস্তবায়ন হলেও অনেক কাজ এখনো বাকি। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে যোগ্য প্রার্থী প্রয়োজন।

মনোনয়ন চাইছেন মির্জা ফয়সাল আমিন

এদিকে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নাম মির্জা ফয়সাল আমিন নিজেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চান।

জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন বলেন, তাঁর ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তিনিও দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে কাজ করেছেন। ঠাকুরগাঁওকে একটি সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ জেলা উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে তাঁর ভাইয়ের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন হবে। তিনি দলীয় মনোনয়ন চান, যাতে ভোটাররা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।

মির্জা ফয়সাল আমিন বলেন, নির্বাচনের মূল বিজয় প্রার্থীর নয়, ভোটারের। ভোটাররা যদি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই হবে কাঙ্ক্ষিত বিজয়।

তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী করা, কৃষি ইপিজেড ও বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা এবং পরিত্যক্ত বিমানবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন। তরুণদের নিয়ে কাজ করে বেকারত্ব কমানোরও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

জামায়াতের দেলাওয়ারও প্রস্তুত

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর পাশাপাশি জামায়াতের প্রার্থী হিসেবেও শক্ত অবস্থানে রয়েছেন দেলাওয়ার হোসেন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঠাকুরগাঁও উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পরাজিত হলেও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন দেলাওয়ার হোসেন। এবার উপনির্বাচন হলে সেই ভোটব্যাংককে কাজে লাগিয়ে জয় পাওয়ার লক্ষ্যেই মাঠে রয়েছেন তিনি।

দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ঠাকুরগাঁওবাসী অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাসন দেখেছেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে ওঠেনি। এখন মানুষ সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও আল্লাহভীরু নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছে।

তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে মানুষের প্রত্যাশিত সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে তিনি কাজ করতে চান। পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণ, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং জেলার সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিতে চান তিনি।

দেলাওয়ার হোসেনের দাবি, নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু থাকলে তিনি জয়ী হবেন। ইতোমধ্যে তিনি বিভিন্ন ইউনিয়নে জনসংযোগ করছেন এবং তরুণদের সঙ্গে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে কাজ করার কথা জানাচ্ছেন।

ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ তরুণ ও সংখ্যালঘু ভোটার

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮০ হাজার ৬০৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৩ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬২২। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন চারজন।

এ আসনে সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার। আর তরুণ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭। মোট ভোটকেন্দ্র ১৭৫টি।

ফলে উপনির্বাচনে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি, জামায়াতের ভোটব্যাংক, সংখ্যালঘু ভোটার এবং তরুণ ভোটার—সবকিছুই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অতীতের নির্বাচনী হিসাব

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে অতীতেও পালাবদলের রাজনীতি দেখা গেছে। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির খাদেমুল ইসলাম, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির রেজওয়ানুল হক ইদু চৌধুরী এবং ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের খাদেমুল ইসলাম নির্বাচিত হন।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জয়ী হন। একই বছরের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খাদেমুল ইসলাম নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০১ সালের নির্বাচনে আবারও জয় পান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর ২০০৮ সালে রমেশ চন্দ্র সেন নির্বাচিত হন। পরবর্তী ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয় পান রমেশ চন্দ্র সেন।

তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসনটির হিসাব অনেকটাই বদলে গেছে। মির্জা ফখরুলের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হলে উপনির্বাচনে বিএনপি আসনটি ধরে রাখতে পারবে, নাকি দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত এবার ঘুরে দাঁড়াবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পরই ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে। বিএনপি যদি মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখতে পারে, আর জামায়াত যদি গত নির্বাচনের ভোটকে আরও সংগঠিত করতে পারে, তাহলে উপনির্বাচনটি দুই দলের জন্যই হতে পারে কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক ভোটযুদ্ধ।

শেষ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের হাল কার হাতে উঠবে—বিএনপির, নাকি জামায়াতের—সেই উত্তর মিলবে ভোটের মাঠে।

Share This Article
Leave a Comment