বিরোধী আন্দোলনে দিশাহারা অমিত শাহ গেলেন পুলিশ সদর দপ্তরে

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক:ভারতের নির্বাচন কমিশনবিরোধী আন্দোলন এবং বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ধারাবাহিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। এর মধ্যেই দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরে বৈঠক করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রায় তিন ঘণ্টার ওই বৈঠকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তও উপস্থিত ছিলেন।

বিরোধীদের আগামী ৩০ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী ‘গণ-অভিশংসন’ কর্মসূচি এবং ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে বড় সমাবেশের ঘোষণার পর এই বৈঠক রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য জনসমাগম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বৈঠকে ঠিক কী কী বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

চার বছর পর পুলিশ সদর দপ্তরে অমিত শাহ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে জি-২০ সম্মেলন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন অমিত শাহ। প্রায় চার বছর পর আবারও সেখানে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, বিজেপি নেতারা বিরোধীদের কর্মসূচির সমালোচনা করে একে জনজীবন ব্যাহত করার প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছেন।

উৎসবের মৌসুমে আন্দোলন নিয়ে বিজেপির আপত্তি

দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের প্রস্তাবিত সমাবেশের বিরোধিতা করে বিজেপি কয়েকটি যুক্তি সামনে এনেছে। দলটির নেতাদের দাবি, উৎসবের মৌসুমে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের চলাচল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দিল্লির ব্যবসায়ীদের সংগঠন চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিটিআই) চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েল কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে চিঠি দিয়ে কর্মসূচিটি ১০ নভেম্বরের পর আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েলের দাবি, উৎসবের সময় দিল্লির বাজারগুলোতে বেচাকেনা ব্যাহত হলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। সেপ্টেম্বরের আন্দোলনে প্রায় তিন হাজার কোটি রুপির ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর আশঙ্কা, রামলীলা ময়দানে সমাবেশ হলে ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছাতে পারে।

তবে এসব আর্থিক ক্ষতির হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।

বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা রবিশংকর প্রসাদও বিরোধীদের আন্দোলনের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, উৎসবের মৌসুমে এমন কর্মসূচি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার প্রসঙ্গ

বিরোধীদের ১ নভেম্বরের সমাবেশের তারিখ নিয়েও আপত্তি তুলেছে বিজেপি। দলটির নেতারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পরদিন দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে শিখবিরোধী সহিংসতা শুরু হয়েছিল।

বিজেপি নেতা রবিশংকর প্রসাদের অভিযোগ, এমন একটি ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল দিনে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সমাবেশ আয়োজন শিখ সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে।

অন্যদিকে, বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে কর্মসূচি বাতিলের কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩০ অক্টোবর প্রতীকী গণ-অভিশংসন, ১ নভেম্বর জনসভা

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ঘোষণায় জানিয়েছেন, ৩০ অক্টোবর নয়াদিল্লির অশোকা হোটেলের লনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী ‘গণ-অভিশংসন’ কর্মসূচি পালন করা হবে।

এর এক দিন পর, ১ নভেম্বর ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে দিল্লি চলো অভিযানের আয়োজন করবে বিরোধী জোট। কর্মসূচির সমাপ্তি হবে রামলীলা ময়দানের সমাবেশের মধ্য দিয়ে।

বিরোধীদের দাবি, ওই সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ঘটবে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদেরও এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে ২৮ অক্টোবর দিল্লির তালকাটোরা স্টেডিয়ামে প্রতীকী গণ-অভিশংসন আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ওই দিন স্টেডিয়ামটি পাওয়া না যাওয়ায় বিকল্প স্থান হিসেবে অশোকা হোটেলের লন নির্ধারণ করা হয়। কর্মসূচিতে বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষার্থী, যুবসমাজ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানোর কথাও জানিয়েছেন সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা।

নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরোধ দীর্ঘদিনের। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান জানতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীরা এর আগে অভিশংসনসংক্রান্ত নোটিশ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রথম নোটিশ লোকসভা ও রাজ্যসভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খারিজ করে দেন। দ্বিতীয় নোটিশটি রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের বিবেচনায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিরোধীদের প্রতীকী গণ-অভিশংসন কর্মসূচির সমালোচনা করে বলেছেন, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক সুবিধা পেতে বিরোধীরা বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাচ্ছে।

সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিরোধীদের আন্দোলনকে ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আগামী ৩০ অক্টোবর ও ১ নভেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিতে রাজনৈতিক সমাবেশ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও জনজীবনের ওপর এর প্রভাব এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

Share This Article
Leave a Comment