নিজস্ব প্রতিবেদক: সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। অফিসের সবাই যখন নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, তখন একটি ডেস্কে গিয়ে চোখ আটকে যায়। অন্যদের ডেস্কের তুলনায় সেটি কিছুটা নিচু। সেখানে বসে দুই পা ব্যবহার করে ল্যাপটপে কাজ করছেন এক ব্যক্তি।
কাছে গিয়ে কথা বলে জানা গেল, তাঁর নাম রাশিদুল আজম। সহকর্মীরা অবশ্য তাঁকে রাসেল নামেই ডাকেন।
জন্ম থেকেই দুই হাত নেই রাশিদুলের। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর পড়াশোনা কিংবা কর্মজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পড়াশোনা শেষ করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন। পরে আরও একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই বছর কাজ করে যোগ দেন বর্তমান কর্মস্থলে। ২০০৫ সাল থেকে এখানেই কাজ করছেন তিনি।
দীর্ঘ ২১ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কর্মপরিবেশের কথা জানান রাশিদুল। তাঁর ভাষ্য, একজন প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা, কাজের উপযোগী পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকদের ইতিবাচক মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিদুলের সুবিধার কথা বিবেচনা করে তাঁর জন্য তৈরি করা হয়েছে নিচু একটি ডেস্ক। দুই হাতের পরিবর্তে তিনি দুই পা দিয়েই ল্যাপটপে প্রয়োজনীয় কাজ করেন।
রাশিদুল বলেন, ‘আমি দুটো পা দিয়ে কাজ করছি। হাত দিয়ে কাজ করতে পারছি না। এখানে পা আর হাতের কাজ মিলালে হবে না। পা আর হাত কিন্তু সমানভাবে চলবে না। তবে এই অফিস কিন্তু সেটাকে মেনে নিচ্ছে। তারা এটাও বিশ্বাস করে, আমার কিছু কাজে সময় বেশি লাগবে। আবার অন্য কোনো কাজে হয়তো আমি অন্যদের চেয়ে কম সময় নেব।’
নিজের এই পথচলায় পরিবারের পাশাপাশি সমাজের সহযোগিতার কথাও স্মরণ করেন রাশিদুল। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও সহযোগিতার অভাবে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ নিজেদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে পারেন না। পরিবার ও সমাজ পাশে দাঁড়ালে তাঁরাও নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
রাশিদুলের সহকর্মী ইফতেখারুল হাসান বলেন, রাশিদুলের প্রয়োজন অনুযায়ী অফিসের সবাই তাঁকে সহযোগিতা করেন। কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অসুবিধা হলে সহকর্মীরা তাঁর পাশে দাঁড়ান।
রাশিদুল যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেটির নাম সেন্টার ফর ডিজএবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি)। ঢাকার সাভারের গেন্ডায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাজমুল বারী বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। একজন ব্যক্তি কীভাবে তাঁর সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারবেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
রাশিদুল সম্পর্কে নাজমুল বারী বলেন, তিনি অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়েও দ্রুত কাজ করেন। তাঁর সুবিধার কথা বিবেচনা করেই বিশেষভাবে নিচু ডেস্ক তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, প্রবেশগম্যতা এবং সম–অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ লক্ষ্যেই সরকার কাজ শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেই হবে না, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ভবন ও অবকাঠামোতে তাঁদের চলাচলের উপযোগী ব্যবস্থা নেই। হুইলচেয়ার ব্যবহারের উপযোগী লিফট কিংবা আলাদা ওয়াশরুমের ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অনুপস্থিত। এসব ক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
প্রতিবন্ধকতা রাশিদুলের জন্য থেমে যাওয়ার কারণ হয়নি। বরং নিজের সক্ষমতা ও পরিবারের সহযোগিতাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কর্মজীবনে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর গল্পটি দেখিয়ে দেয়, উপযুক্ত পরিবেশ ও সহযোগিতা পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সাফল্যের পথে অনিবার্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

