‘জান দেব, তবু জুলাই দেব না’—নীলফামারীতে ইনকিলাব মঞ্চের সমাবেশে জাবের

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read

জেলা প্রতিনিধি, নীলফামারী: শহীদ ওসমান হাদীকে কেন হত্যা করা হলো এমন প্রশ্ন তুলে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেছেন, শহীদ ওসমান হাদী বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, গত ৫৫ বছর ধরে স্বাধীনতার কথা বলা হলেও কার্যত দিল্লির প্রেসক্রিপশনেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। সেই আধিপত্য থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই বাংলাদেশের জনগণ জুলাইয়ের মতো একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে নীলফামারী শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বড় বাজারে গিয়ে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচির সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তিনি।

শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যার দ্রুত বিচার, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাই, পিলখানা ও শাপলা গণহত্যার বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

সমাবেশে আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘এখনো শত শত মানুষ শহীদ ওসমান হাদীর কবরের সামনে গিয়ে তাঁর জন্য দোয়া করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে মনে করেছে, এখন কথা বলার মতো কেউ নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা ব্যক্তিদের গণমাধ্যমের মাধ্যমে চরিত্রহনন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে নষ্ট করা হয়েছে যে, যেখানে মানহানির মামলা হওয়ার কথা, সেখানে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হচ্ছে।’

সরকারের সমালোচনা করে আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আমরা সরকারকে আহ্বান জানাতে চাই, আপনি বাংলাদেশের কোনো একটি ব্যবস্থাও ঠিক করতে পারেননি। এমনকি যেটা পারছেন না, সেটাও স্বীকার করছেন না। আমরা যদি তেলের কথা বলি, আমাদের সামনে যুদ্ধের প্রসঙ্গ দেখানো হয়। আমরা যদি চালের কথা বলি, তখন সারের দাম নিয়ে হাজির হওয়া হয়। এভাবে বাংলাদেশের জনগণকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এখানে এসেছি আমাদের অধিকারের কথা বলতে। আমরা একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্নের বীজ বপন করতে এসেছি। শহীদ ওসমান হাদী আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, আধিপত্যের সঙ্গে আপস করে প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা জয় নয়; বরং আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে শহীদ হওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই। আমরা তো সেই শহীদ ওসমান হাদীর সহযোদ্ধা, জান দেব, তবু জুলাই দেব না।’

জুলাই সনদের উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘জুলাই সনদ কি শুধুমাত্র শেখ হাসিনাকে বিদায় করে তারেক রহমানকে ক্ষমতায় আনার জন্য হয়েছিল, নাকি বাংলাদেশকে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিনির্মাণ করার জন্যই জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল? আজ যারা ৭০ শতাংশ মানুষের গণভোটের রায় মানছে না, যারা শাপলা ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার করছে না, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করে আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, “আজকে বিচারব্যবস্থায় কোনো ঘটনা ভাইরাল না হলে বিচার হয় না। আপনাকে কেউ মেরেও ফেললে, রাষ্ট্র যদি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আপনি বিচার পাবেন না। আমরা এমন একটি বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো আশ্বাসের প্রয়োজন হবে না, দলীয় কোনো প্রভাব থাকবে না। বাংলাদেশের একজন নাগরিক অন্যায়ভাবে হেনস্তা বা হত্যার শিকার হলে রাষ্ট্রই তাঁর বিচার নিশ্চিত করবে। আমরা তো এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণকে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে, এটা হতে পারে না। খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে আর আমরা ইনসাফের জন্য রাস্তায় রাস্তায় হাঁটব, এটাও হতে পারে না।’

আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানের পিতা হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কিংবা তাঁর মাতা হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসে না; বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে তাঁদের অবস্থানের কারণেই ভালোবাসে।

তিনি বলেন, ‘আজকে যারা জুলাইয়ের পর দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাংলাদেশে আসার সুযোগ পেয়েছেন, আগে তাঁদের অনলাইনে মাঝেমধ্যে কথা বলার সুযোগটুকুও দেওয়া হতো না। শুধুমাত্র ১ হাজার চার শত শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজ মানুষ ভোট দিতে পেরেছে বলেই আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন। সেই জুলাইকে অবজ্ঞা করবেন না। আল্লাহতালা ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এনেছে।’

নাগরিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা সাধারণ মানুষের নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তাঁরা তাঁদের পক্ষে থাকবেন। আর যারা জনগণের ওপর জুলুম করবে, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে মানুষের অধিকার হরণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ফল বিক্রেতা, কৃষক কিংবা শ্রমিক শুধু বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবেই তাঁর প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা ভোগ করবেন। বিএনপি করার কারণে কেউ বিশেষ কার্ড পাবেন, আর অন্যরা পাবেন না এমনটা হতে পারে না। বাংলাদেশের নাগরিক হলেই সবাই নাগরিক সুবিধা পাবেন। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চাই।’

সবশেষে সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। দাবিগুলো হলো— শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার, গণভোটের গণরায়ের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাই, পিলখানা ও শাপলা গণহত্যার বিচার।

Share This Article
Leave a Comment