নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের সমর্থন: যুক্তরাষ্ট্র কি ইসরায়েলকে নিয়ে আবার ইরানে হামলার ছক কষছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 Min Read
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সমর্থনকে নতুন যুদ্ধ শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; কূটনৈতিক সমাধানের পথও এখনো খোলা রয়েছে।

গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী এবং শান্তির জন্য আরও বড় অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। ইরানকে সামরিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, তেহরান দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন না করলে বাকি কাজও শিগগিরই শেষ করা হবে।

ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কেউ ইসরায়েলের নেতৃত্বে এলে ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বাকি কাজ যুক্তরাষ্ট্রকে একাই সম্পন্ন করতে হবে। তিনি এমন পরিস্থিতি চান না বলেও জানান।

নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুকে সমর্থন

ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী, সাহসী ও মেধাবী নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষ্য, নানা রাজনৈতিক চাপ ও বিরোধিতার মধ্যেও নেতানিয়াহু টিকে আছেন এবং আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছেন।

নিজের পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছ থেকে এমন অংশীদারত্বই প্রত্যাশা করে। ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে নিজের পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থনের কথা জানান।

এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইসরায়েলের নির্বাচনে তিনি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন না। তবে চলতি মাসের শুরুতে টাইম সাময়িকী এবং গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া বক্তব্যে তাঁর অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না।’

ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫১। এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, নির্বাচনে কোনো পক্ষেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত নয়।

ট্রাম্পের সমর্থন কতটা প্রভাব ফেলবে

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল মনে করেন, নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গত কয়েক মাসে দুই নেতার সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা গেছে।

আল-জাজিরাকে ভাকিল বলেন, এই সমর্থনের মাধ্যমে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে অপরিহার্য নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। এতে তাঁর সমর্থকেরা আরও উৎসাহিত হতে পারেন। তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তি ও সংকট কাটিয়ে উঠতে শুধু ট্রাম্পের সমর্থন যথেষ্ট হবে না।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগও ট্রাম্পের ঘোষণাকে নেতানিয়াহুর জন্য ‘রাজনৈতিক উপহার’ বলে অভিহিত করেছেন।

তাঁর মতে, ডানপন্থী দলগুলোর বিভক্তি, ভোটারদের হতাশা এবং ৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহু সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন—এসব বিষয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্পের সমর্থন কিছু দ্বিধাগ্রস্ত ভোটারকে লিকুদ পার্টির দিকে টানতে পারে। তবে এর ফলে নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হবে, এমন সম্ভাবনা কম।

ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কা কেন

নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানকে ঘিরে দুই দেশের সামরিক কৌশল। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত আপাতত অনেকটা থেমে থাকলেও পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।

সংঘাতের পর ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইরানের জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে নির্দেশ অমান্যকারী জাহাজে হামলার অভিযোগও ওঠে।

গত মাসে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় আরও বেশি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করায় তেল পরিবহন যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে চলতি মাসের শুরুতে ইরানের ধারাবাহিক হামলার কারণে এই পথে তেল রপ্তানি আবারও ব্যাহত হয়।

গত মাসে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়। বিনিময়ে তেহরান কয়েকটি শর্ত পূরণের দাবি জানায়, যার মধ্যে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ও ছিল। তবে প্রস্তাবটি সংকট নিরসনে কার্যকর হয়নি।

রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রস্তাবটি এখনো বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে নিলে ছয় দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব এবং পরদিন থেকেই আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি

রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি অভিযোগ করেন, নিজের কারাদণ্ড এড়াতে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে চাইছেন।

তিনি লেখেন, আগেরবার ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হলেও দেশটি আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তেহরান তার জবাব দিতে প্রস্তুত বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

আরাগচির অভিযোগ, নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ও আইনি স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন। এর ফলে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশকেই পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সমর্থন এবং ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত মানেই কূটনৈতিক উদ্যোগ পরিত্যাগ করা নয়।

আন্দ্রেয়াস ক্রিগের ভাষ্য, মার্কিন নৌ অবরোধ ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, সময় তাদের পক্ষে রয়েছে। ট্রাম্পের হিসাব হতে পারে, বড় ধরনের ছাড় না দিয়েই ইরানকে শেষ পর্যন্ত পরমাণু কর্মসূচিতে ছাড় দিতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি করানো সম্ভব।

তবে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি জোরালো হলে তেহরানও সংঘাত বাড়িয়ে আলোচনায় নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের সম্ভাবনা

সানাম ভাকিলের মতে, নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়িয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকছে।

ভাকিলের মতে, এই সমর্থনের মাধ্যমে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের দায় থেকেও নিজেকে আলাদা রাখতে পারছেন না। আগে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের চাপের কারণে সংঘাতে জড়িয়েছে—এমন যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ থাকলেও এখন সেই অবস্থান দুর্বল হবে।

তবে দুই নেতা নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে কোন পক্ষ বেশি চাপ দিয়েছিল, সেই প্রশ্নেরও মীমাংসা হয়নি।

অন্যদিকে ট্রাম্পের বক্তব্য ইরানের নেতাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য একই—এমন ধারণা আরও জোরালো করতে পারে। আবার নেতানিয়াহুকে ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্পের অনীহা ওয়াশিংটনের সামরিক সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করতে পারে।

নভেম্বরের পর বাড়তে পারে ঝুঁকি

ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন না। তবে দেশটির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগেই নতুন হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে পেন্টাগন।

গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে তারা জানতে পেরেছে, দুই দেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইরানে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনী বাধা কেটে গেলে দুই দেশের সামরিক বাহিনী নতুন অভিযানের বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন ইরানকে ঘিরে সামরিক চাপ বৃদ্ধির রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। তবে নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হরমুজ প্রণালি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক অবস্থান—এসব বিষয়ই আগামী দিনের পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


 

Share This Article
Leave a Comment