জন্মের পর মায়ের সঙ্গে কারাগারে, সাত বছর পর রাথির সামনে নতুন পৃথিবী

নিজস্ব প্রতিবেদক
4 Min Read
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে আসে শিশু মোবাশ্বেরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক: এক-দুই বছর নয়, জীবনের প্রথম সাতটি বছরই কারাগারে কেটেছে মোবাস্বেরা খানম রাথির। জন্মের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকা রাথির কাছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারই হয়ে উঠেছিল পরিচিত পৃথিবী। কারাগারে থাকা অন্যরা তার নাম দেন মোবাস্বেরা খানম রাথি। মা কামরুন নাহার মণি অবশ্য মেয়েকে ডাকেন ‘রোজা’ নামে।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন কামরুন নাহার মণি। ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল গ্রেপ্তারের সময় তিনি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে তাঁর কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। নাম রাখা হয় মোবাস্বেরা খানম রাথি।

এরপর মায়ের সঙ্গেই কারাগারে বেড়ে উঠতে থাকে রাথি। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় মাত্র এক মাস বয়সী রাথি ছিল মায়ের কোলে।

দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে কারাগারে থাকার পর গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে খালাস পান কামরুন নাহার মণি। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই মামলায় ১০ আসামিকে খালাস দেন। একই রায়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মুক্তির পর মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মণি। তিনি বলেন, কারাগারে মেয়েকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করতেন। কখনো মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে দিতেন, আবার কখনো বালিশকে স্কুলব্যাগ বানিয়ে পড়াতেন। তাঁর ভাষায়, একজন মা হিসেবে তাঁর ও মেয়ের কষ্ট কেউ বুঝবে না। তিনি মেয়েকে নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চান।

রাথির নানি নুর নাহার বলেন, মামলার খরচ চালাতে গিয়ে তাঁদের পারিবারিক সম্পদ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণ করে মামলা চালাতে হচ্ছে। অর্থের অভাবে নিয়মিত নাতনিকে দেখতেও যেতে পারেননি তিনি।

বাবার কাছেও ছিল অপরিচিত

মায়ের সঙ্গে কারাগারে সাত বছর কাটলেও বাবার সান্নিধ্য খুব বেশি পায়নি রাথি। মণির স্বামী রাশেদুল আলম খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মেয়েকে কাছে না পাওয়ার দীর্ঘ কষ্টের কথা লিখেছেন।

তিনি লিখেছেন, বাবা হয়েও মেয়েকে বাবার মতো করে কাছে পাওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁর। ফেনী কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় দেখা হলেও দূর থেকে মেয়েকে দেখতে হতো। কখনো জানালার ফাঁক দিয়ে মেয়ের ছোট্ট পায়ের আঙুল ছুঁয়ে আদর করার চেষ্টা করেছেন। পরে কাশিমপুর কারাগারে তাঁদের মাঝখানে ছিল নিরাপত্তার খাঁচা।

রাশেদুল আলমের ভাষ্য, দূরত্বের কারণে রাথি তাঁকে ঠিকমতো চিনত না। সাতটি জন্মদিন ও ১৪টি ঈদ মেয়েকে ছাড়া কেটেছে তাঁর।

যে মামলায় সাত বছর কারাগারে

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন।

বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন।

দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কামরুন নাহার মণিসহ ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

এই রায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় কামরুন নাহার মণির দীর্ঘ কারাবাস। আর জন্মের পর থেকে মায়ের সঙ্গে কারাগারে বেড়ে ওঠা রাথির সামনে খুলে যায় কারাগারের বাইরের নতুন এক পৃথিবী।

Share This Article
Leave a Comment