প্রতিটি খাবারেই কি বিপদ? নিরাপদ থাকতে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read
ছবি:সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাজারের বিভিন্ন খাদ্যপণ্যেমাইক্রোপ্লাস্টিক , ভারী ধাতু ও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক গবেষণা সামনে এসেছে। দুধ, মাছ, পানি ও ভোজ্যতেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক, মুরগির মাংস ও ডিমে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ এবং ফল ও সবজিতে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়।

এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর খাবার নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্য পুরোপুরি বাদ দেওয়া সমাধান নয়। বরং খাবার কেনা, সংরক্ষণ ও রান্নায় সতর্ক থাকার পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

গবেষণায় বাংলাদেশের পানি, পলি, মাছ, লবণ, কোমল পানীয়, দুধ ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। একইভাবে কিছু গবেষণায় মুরগির মাংস ও ডিমে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ এবং ফল ও সবজিতে ক্যাডমিয়াম ও সিসার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষতিকর দূষকের সংস্পর্শে থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সমস্যা বাড়তে পারে। ক্যাডমিয়ামের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ কিডনি ও হাড়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম. মুজাহেরুল হক বলেন, খাদ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং এ বিষয়ে আইন প্রয়োগ ও তদারকি বাড়াতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলেন, খাদ্য ও পানীয়তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণায় মানবদেহের বিভিন্ন অংশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিনের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো কিছু দূষক দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি নিরাপদ ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে খাদ্য কেনার পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে পুষ্টিবিদরা বলছেন, কোনো খাবারে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতির খবর পাওয়া গেলেই সেই খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস সোসাইটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও পুষ্টিবিদ তাহমিয়া বিনতে সারওয়ার বলেন, ঝুঁকি নির্ভর করে কোন পদার্থ, কী পরিমাণে এবং কত দীর্ঘ সময় শরীরে প্রবেশ করছে তার ওপর।

তিনি বলেন, ফল, দুধ, মাছ, মাংস ও ডিমের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্য একেবারে বাদ দিলে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও প্রোটিন থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই খাবারে বৈচিত্র্য রাখা এবং বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে খাদ্যপণ্য কেনাই ভালো।
খাবার নিরাপদ রাখতে কয়েকটি সাধারণ অভ্যাসের কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর পরামর্শ, ফল ও সবজি পরিষ্কার প্রবহমান পানিতে ভালোভাবে ধুতে হবে। কাঁচা মাংস ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখতে হবে। খাবার ভালোভাবে রান্না করতে হবে এবং রান্না করা অবশিষ্ট খাবার দ্রুত ঠান্ডা করে সংরক্ষণ করতে হবে।

ভোক্তা অধিকারকর্মীরাও কোনো প্রতিবেদন দেখে তাৎক্ষণিক আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, খাদ্য নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, তবে যাচাই না করে কোনো তথ্যকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়ানো উচিত নয়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শোয়েব জানান, বাজার পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারকে সুপারিশও করা হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে পারদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী, স্তন্যদানকারী নারী ও ছোট শিশুদের জন্য কম পারদযুক্ত মাছ বেছে নেওয়া ভালো। মলা, ঢাইন, টেংরা এবং রুই, কাতলা বা তেলাপিয়ার মতো মাছ খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

পানির ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পান করা, রান্না এবং খাবার ধোয়ার কাজে পরীক্ষিত নিরাপদ নলকূপের পানি অথবা নিরাপদভাবে ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করতে হবে। কারণ দূষিত পানি রান্নায় ব্যবহার করলে খাবারের মাধ্যমেও দূষক শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এ ছাড়া পাতাযুক্ত শাকসবজি, শস্য ও মূলজাতীয় ফসলে ক্যাডমিয়াম জমার আশঙ্কা থাকায় খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শস্য ও সবজি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, খাবার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে দেওয়া যাবে না। বিভিন্ন ধরনের তাজা ও প্রাকৃতিক খাবার খাওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে খাবার প্রস্তুত করা এবং নিরাপদ উৎস থেকে খাদ্য কেনার অভ্যাস গড়ে তুললেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

Share This Article
Leave a Comment