সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ছেলের মরদেহ একবার দেখতে চান বাবা–মা

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read
ছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থেকেও পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেননি আবদুল বাছির। ২০২০ সালে দেশে ফিরে শুরু করেন কৃষিকাজ। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২২ সালের শেষ দিকে বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে সৌদি আরবে পাঠান। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন নজরুল। তখনো ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ করা বাকি।

এরপর প্রায় তিন বছর ছেলের মুক্তির অপেক্ষায় ছিলেন বাবা–মা। কিন্তু গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তাঁরা জানতে পারেন, সৌদি আরবে তাঁদের ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই খবর শোনার পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এখন বাবা–মায়ের একটাই আকুতি—শেষবারের মতো যেন ছেলের মরদেহ দেখতে পারেন তাঁরা।

নজরুল ইসলাম (২৫) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আবদুল বাছির ও রহিমা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁরা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার এ তথ্য জানায় দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

ঋণ করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন সৌদি আরবে

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২০ সালে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকেও পরিবারের আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।

নজরুল ২০২০ সালে একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।

সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় দেশটির পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের প্রায় এক মাস পর বিষয়টি জানতে পারে তাঁর পরিবার। এরপর থেকে কারাগারেই ছিলেন নজরুল।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে বাবা–মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। সর্বশেষ ১১ অক্টোবর পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। সেদিন দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা বলেছিলেন তিনি।

এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে পরিবারকে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানান।

এই খবর শোনার পর শোকে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, খবরটি জানার পর নজরুলের ৬৫ বছর বয়সী ফুফু আবেদা বেগম মূর্ছা যান। ওই দিন রাত দুইটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্বজনদের

নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা। তাঁদের দাবি, নজরুল ছিলেন শান্ত স্বভাবের ও ভদ্র ছেলে। তাঁর আচরণের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়টি তাঁরা মেলাতে পারছেন না।

নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া জানান, সৌদি আরবে কাজ করার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে নজরুলের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি তিনি ফোনে তাঁর বাবা–মাকেও জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক বলে নজরুল তাঁদের জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তাঁরা। এই বিরোধের জেরেই নজরুল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন তাঁরা। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, তাঁর বন্ধুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশ্বাস করা তাঁর জন্য কঠিন। নজরুলের পরিচিতজনদের কাছেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নজরুল যে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমানের ভাষ্য, শিক্ষার্থী হিসেবে নজরুলের আচরণ ও চলাফেরা ভালো ছিল। দেশে থাকার সময় তাঁর মধ্যে আপত্তিকর কোনো আচরণ তিনি দেখেননি বলে জানান এই শিক্ষক।

শেষবারের মতো ছেলের মরদেহ দেখতে চান

ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন আবদুল বাছির ও রহিমা বেগম। তাঁদের সংসারে এখন শোকের ছায়া। ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর পর এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না তাঁরা।

আবদুল বাছির জানান, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ধার করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। প্রথম সাত–আট মাসে নজরুল প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর গ্রেপ্তার হওয়ায় দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

ছেলের মৃত্যুর খবরের পাশাপাশি বোনের মৃত্যুতে আরও ভেঙে পড়েছেন তিনি। এখন তাঁর একমাত্র চাওয়া, সৌদি আরব থেকে ছেলের মরদেহ দেশে এনে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাওয়া।

মা রহিমা বেগমও ছেলের স্মৃতি মনে করে বারবার কাঁদছেন। তিনি জানান, ছেলে এক মাস পরপর ফোন করত। কথা বলার সুযোগ মিলত মাত্র এক থেকে দুই মিনিটের জন্য। ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয় বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রহিমা বেগমের আকুতি, জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই তাঁর—শেষবারের মতো যেন ছেলের মরদেহ দেখতে পারেন।

 

Share This Article
Leave a Comment