২০২৭ সালে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া এফটিএ হবে, ঢাকায় আলোচনা শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক:বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা। এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী প্রথম দফার আলোচনা উদ্বোধন করেন বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। এ সময় আলোচনার কাঠামো, পরিধি ও কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) স্বাক্ষরিত হয়।

অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার ৩১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন রশিদি সাইদ। বাংলাদেশের পক্ষে আলোচনা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন। এ ছাড়া দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইতিবাচক হলেও বাণিজ্য বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে টেকসই ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। বর্তমান আনুষ্ঠানিক আলোচনা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বাণিজ্যসচিবের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে এফটিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় একটি বাজার। হালাল শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতি মালয়েশিয়ার সমর্থনের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

দুই দেশের বাণিজ্য ২৮৪ কোটি ডলার

মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের প্রধান রশিদি সাইদ বলেন, প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে শুধু শুল্ক কমানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

তিনি জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮৪ কোটি মার্কিন ডলার। এফটিএ কার্যকর হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

পারস্পরিক সমঝোতা, নমনীয়তা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে ২০২৭ সালের মধ্যে আলোচনা শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন রশিদি সাইদ। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর এ প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শুল্ক কমানো ও বাণিজ্য সহজ করার উদ্যোগ

বাংলাদেশের আলোচনা দলের প্রধান খাদিজা নাজনীন বলেন, এফটিএ কার্যকর হলে দুই দেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে এবং বাণিজ্যিক বাধা কমবে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করার ক্ষেত্রেও চুক্তিটি ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি জানান, আলোচনায় পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, পণ্যের উৎপত্তিবিধি এবং শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ঐকমত্যে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ কেন গুরুত্বপূর্ণ

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রায় ১৪টি দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করার উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হলেও এত দিন তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টের মাঝামাঝি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া সফরের পর দুই দেশের মধ্যে এফটিএ নিয়ে আলোচনা নতুন গতি পায়। পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি আরও এগিয়েছে।

বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা মালয়েশিয়ায় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যভেদে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিয়ে থাকেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কসুবিধা পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে এফটিএ হলে শুল্ক কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চুক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা, পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এ আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী পর্যায়ের দর-কষাকষি ও চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া।

Share This Article
Leave a Comment