আফগানিস্তানে ‘ইসলামবিরোধী’ দাবি করে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করল তালেবান

নিজস্ব প্রতিবেদক
4 Min Read
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে তালেবান সরকার। এই চিকিৎসাপদ্ধতি ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমন দাবি তুলে অস্ত্রোপচার বন্ধ করা হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। এর ফলে দেশটিতে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বহু রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।

চিকিৎসকদের মতে, আফগানিস্তানে বিস্ফোরণ, দুর্ঘটনা ও কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন আঘাতের কারণে অনেক মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তাঁদের একটি অংশের জন্য কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কার্যকর চিকিৎসা হতে পারে। কিন্তু এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোগীদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে এবং চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকে আফগানিস্তানে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তালেবান। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধের নির্দেশকে সেই ধারাবাহিকতার নতুন ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

কয়েক মাসের কর্মসূচি বন্ধ, বাড়ছে রোগীর অপেক্ষা

রাজধানী কাবুল ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদে স্থানীয় চক্ষুচিকিৎসকদের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কয়েক মাস পর এই নিষেধাজ্ঞা আসে।

কাবুলের নূর আই হাসপাতালের চিকিৎসক নূর জামান হাশিম জানান, নির্দেশ জারির আগে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে তাঁদের হাসপাতালে ৯০টি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অপেক্ষমাণ রোগীদের বড় একটি অংশ তরুণ। বিস্ফোরণ, সড়ক দুর্ঘটনা, বিভিন্ন ধরনের আঘাত কিংবা ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে তাঁদের অনেকে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

চিকিৎসক হাশিম বলেন, কয়েক দশকের সংঘাত আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশটিতে প্রয়োজনের তুলনায় চক্ষুবিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কর্নিয়ারও ঘাটতি রয়েছে।

তিনি আরও জানান, কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। শাস্তির আশঙ্কায় চিকিৎসকেরা সেই নির্দেশ অমান্য করতে সাহস পাচ্ছেন না।

বিনা মূল্যের চিকিৎসা কর্মসূচিও বন্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ভিত্তিক দাতব্য সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব পাকিস্তানি ডিসেন্ট অব নর্থ আমেরিকা (এপিপিএনএ) ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছে। অঙ্গদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা কর্নিয়া ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তা করে সংস্থাটি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে আফগানিস্তানেও এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। এর আওতায় দেশটিতে ১৫০টির বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাকিস্তানের পেশোয়ারে তিনজন আফগান চক্ষুচিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।

এপিপিএনএর কর্নিয়া কর্মসূচির প্রধান এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জাফফার মীর ফাউন্ডেশনের প্রধান ফাওয়াদ জাফফার জানান, ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন।

তিনি বলেন, প্রায় চার মাস আগে আফগানিস্তানে কর্মসূচিটি চালু করা হয়েছিল। সেখানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ব্যাপক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞার কারণে পুরো কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীরা

নিষেধাজ্ঞার কারণে চিকিৎসা নিতে না পারা রোগীদের একজন কাবুলের আখেরের রস বিক্রেতা সালামত খান। ২০২৩ সালে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। বিনা মূল্যে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের সুযোগ সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি হাসপাতালে যোগাযোগ করেছিলেন।

সালামত খানের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা তাঁকে সেপ্টেম্বরে অস্ত্রোপচারের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু আগস্টে কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন জালালাবাদের ৪০ বছর বয়সী খাদিজা বেগম। বিস্ফোরণে চোখে আঘাত পাওয়ার পর তিনি দুই মাস আগে জালালাবাদ আই হাসপাতালে নিবন্ধন করেছিলেন।

খাদিজা জানান, গত মাসে তালেবান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কর্মসূচি বন্ধের নির্দেশ দেয়। কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, এই চিকিৎসাপদ্ধতি ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান

আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অনুমতি দেওয়ার জন্য তালেবান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এপিপিএনএ। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, কয়েক দশকের সংঘাতে বিপর্যস্ত দেশটিতে এ ধরনের চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি।

কর্নিয়া হলো চোখের সামনের স্বচ্ছ স্তর, যা আলোকে চোখের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এই স্তর ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বচ্ছ হয়ে গেলে নির্দিষ্ট কিছু রোগীর দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়ার পরিবর্তে দাতার কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করে দৃষ্টিশক্তি উন্নত করার সুযোগ থাকে।

চিকিৎসকদের মতে, আফগানিস্তানে এই চিকিৎসা বন্ধ থাকলে কর্নিয়াজনিত সমস্যায় আক্রান্ত বহু রোগীর দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের জন্য বিকল্প চিকিৎসার ব্যবস্থা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

Share This Article
Leave a Comment