সুন্দরবনে যেতে জেলেদের ‘ভয়’, দস্যুদের চাঁদার আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read
ছবি : সংগৃহীত

ডেস্ক রিপোর্ট

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের জন্য খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার। তবে বনে প্রবেশের আগে স্বস্তির বদলে অনেক জেলের মনে এখনো কাজ করছে আতঙ্ক। কারণ, মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়ে আবারও জলদস্যুদের চাঁদার মুখে পড়তে হবে কি না—এই শঙ্কা রয়েছে তাঁদের মধ্যে।

জেলেদের আশঙ্কা, বনে গিয়ে উপার্জনের একটি বড় অংশ যদি দস্যুদের চাঁদা হিসেবে দিতে হয়, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

কয়রা থেকে ফেরার পথে সাতক্ষীরা রেঞ্জের খোলপেটুয়া নদীর তীরে নীলডুমুর গ্রামের জেলে রিপন গাজীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, সুন্দরবনের মাছ ও কাঁকড়া ধরেই তাঁদের জীবিকা চলে। নিষেধাজ্ঞার তিন মাস ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে।

রিপন গাজীর ভাষায়, বনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরার পর যদি দস্যুদের চাঁদা দিতে হয়, তাহলে সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

স্থানীয় কয়েকজন জেলের অভিযোগ, অতীতে দস্যুদের কাছ থেকে ‘স্লিপ’ বা টোকেন সংগ্রহ করে অনেক বনজীবীকে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হয়েছে। ১৫ দিনের জন্য একটি নৌকা নিয়ে বনে যেতে নৌকাপ্রতি প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আগাম চাঁদা দিয়ে ওই স্লিপ নিতে হতো বলে জানান তাঁরা।

সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জলদস্যু দমনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জেলেদের দাবি, দস্যুদের সেই আতঙ্ক এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. শামসুল আরেফীন বলেন, সুন্দরবন খুলে দেওয়ার পর দ্রুত জেলেদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।

তিনি জানান, লোকালয়ে থাকা দস্যুদের সহযোগীদের বিষয়েও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলেদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যারা টোকেন বা স্লিপ দেয়, তাদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

এদিকে, সুন্দরবন ঘিরে জীবিকার প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। কয়রার শাকবাড়িয়া ও কয়রা নদীর তীরবর্তী পাথরখালী, মঠবাড়ি, কাটকাটা ও মহেশ্বরীপুর এলাকায় দেখা গেছে, নদীর তীরে নৌকা ও জাল প্রস্তুতের ব্যস্ততা।

মহারাজপুর এলাকার জেলে খায়রুল আলম জানান, নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে সংসার চালাতে তাঁকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে। সেই টাকা দিয়েই নৌকা ও জাল মেরামতের কাজ শেষ করেছেন।

শ্যামনগরের বনজীবী জেলে আবদুল খালেক জানান, একটি নৌকায় সাধারণত দুই থেকে তিনজন জেলে থাকেন। ছয় থেকে সাত দিনের খাবার ও জ্বালানি সঙ্গে নিয়েই তাঁদের বনে যেতে হয়।

তাঁর ভাষ্য, দস্যুদের কবলে পড়লে মাছ, জাল, খাবারসহ নৌকার অন্যান্য সরঞ্জাম হারানোর ঝুঁকি থাকে। দরিদ্র মানুষই মূলত জীবিকার তাগিদে এমন অনিশ্চিত যাত্রায় সুন্দরবনে যান।

বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে স্থলভাগ ৪ হাজার ১৪৩ এবং জলভাগ ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার। এই বনে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, উদ্ভিদ, পাখি, সরীসৃপ ও বন্য প্রাণী।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে জেলে, বনজীবী ও পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ থাকে।

তবে জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ও গোপনে মাছ শিকার বন্ধ হয়নি। বন বিভাগের নজর এড়িয়ে কেউ কেউ বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে মাছ ও কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

তাঁদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময়ে অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ শিকারকারীদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

সুন্দরবনের সম্পদ আহরণের জন্য প্রায় ১২ হাজার নৌকার বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট বা বিএলসি রয়েছে। এসব নৌযানের মাধ্যমে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা মাছ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ আহরণ করেন। পাশাপাশি সুন্দরবনের সাতটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করেন।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে বন বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। বনদস্যুদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে কোস্টগার্ডকে জানানো হচ্ছে এবং দস্যু দমনে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।

বন অপরাধ ঠেকাতে স্মার্ট টহল দলের পাশাপাশি পায়ে হেঁটেও টহল দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। জেলেদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।

তবে সুন্দরবন খুলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা জেলেদের এখন একটাই প্রত্যাশা—জীবিকার সন্ধানে বনে গিয়ে যেন দস্যুদের চাঁদা কিংবা হামলার শিকার হতে না হয়। নিরাপদে মাছ-কাঁকড়া ধরে পরিবারে ফিরতে চান তাঁরা।

Share This Article
Leave a Comment