নিউজ ডেস্ক: কুমিল্লায় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা দামি আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্তে এর পাশাপাশি উঠে এসেছে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা, বয়সে বড় কয়েকজনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের বিষয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার দিন অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোন দিয়ে টিকটকের ভিডিও ও ছবি তোলার কথা বলে তাকে বাসা থেকে বের হতে রাজি করানো হয়। শুক্রবার দুপুরের দিকে আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পর সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের সঙ্গে তার দেখা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিম ও তুহিনকে একসঙ্গে দেখা গেছে। পরে আরও দুজন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। একপর্যায়ে তারা লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন স্থানে যায়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সেখানে অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সে বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে আঘাত করা হয়। পরে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে ফোনটি নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় জড়িতরা—এমন তথ্য জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন কিশোর। আরও একজন তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তে অপ্রতিমের বাবার মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করা এক কিশোরের সঙ্গে অপ্রতিমের পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের তথ্যও পাওয়া গেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিল এবং সম্প্রতি অপ্রতিম সেই টাকা ফেরত চাইছিল।
তদন্তকারীদের কাছে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড় কয়েকজনের ঘনিষ্ঠতা। পুলিশ কর্মকর্তারা এই সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। অপ্রতিম ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার সঙ্গে বয়সে বড় কয়েকজনের ছবি, ভিডিও এবং টিকটক কনটেন্ট তৈরির তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার ফোনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ওই কিশোরের একাধিক কল আসে। পরে তাকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর আরও একজনের নাম সামনে আসে।
তদন্তকারীরা আরও খতিয়ে দেখছেন, ঘটনার দিন ওই কিশোর নিজের ফোন সঙ্গে না নিয়ে পরিবারের অন্য একজনের ফোন কেন ব্যবহার করেছিল। পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির বিষয়টি আড়াল করার উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে অপ্রতিমের আইফোনটি পরে তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনটি বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
অপ্রতিম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সে শান্ত, মিশুক ও পড়াশোনায় ভালো ছিল।
নিখোঁজ হওয়ার পর অপ্রতিমের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তার সন্ধান চেয়ে পোস্ট দেন। পরদিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর অপরাধচক্রের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আগের কোনো অপরাধের রেকর্ড আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড এখন শুধু একটি হত্যা মামলার তদন্তেই সীমাবদ্ধ নেই। শিশু-কিশোরদের বয়সে বড়দের সঙ্গে বন্ধুত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক সম্পর্ক এবং পরিবারের অগোচরে মেলামেশার ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব তথ্যের কোনটি হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ এবং কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

