সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
7 Min Read
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।ছবি:সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক: জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দল, মত, ধর্ম ও বর্ণের পার্থক্য ভুলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য। নাগরিকদের ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে গুরুত্ব
বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ বাড়ানোর কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, স্টার্টআপ খাতে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন দেশের প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।
নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এসব সুবিধাকে সমন্বিত করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে এবার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

কর্মমুখী শিক্ষার জন্য কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম ও বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেও বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত জুনে দেশব্যাপী আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
প্রযুক্তিতে বৈষম্য কমানোর আহ্বান
বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল কিছু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন।
এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা
বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উত্তরণকে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতাও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
শান্তি ও মানবিক বিশ্বের আহ্বান
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব সংকটের সমাধানে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি।

বিবদমান দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জাতিসংঘকে একটি সমঝোতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন জানান।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উদ্যোগ
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান।আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ক্লিন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা জানান তিনি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে আন্তসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।

নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষায় অঙ্গীকার
নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা মানবতার সেবায় কাজ করছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’
ভাষণের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণদের নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ, নারীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা এবং শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখাই বাংলাদেশের লক্ষ্য।

‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

Share This Article
Leave a Comment