এলপিজির সংকট, ১২ কেজির সিলিন্ডার ছাড়িয়েছে ২ হাজার টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 Min Read
ছবি:সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া, সরবরাহে ঘাটতি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশে এলপিজি আমদানি কমেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় বাজারে প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির এলপিজি ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী দিনে সংকট আরও বাড়তে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছিল। ওই মাসে ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি করে। চলতি মাসে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯টি প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য বলছে, দেশে এলপিজি ব্যবসার জন্য ৫২টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স রয়েছে।
এর মধ্যে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্ল্যান্টে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার ব্যবস্থা রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। তবে নিয়মিতভাবে আমদানি করে মাত্র ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক পরিবহন ঝুঁকি বাড়ায় জাহাজভাড়াও কয়েক গুণ বেড়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনা ও জাহাজে হামলার কারণে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এলপিজি আমদানিকারকদের দাবি, যেসব প্রতিষ্ঠানের আগে থেকেই আমদানির চুক্তি রয়েছে, তারাও চুক্তির তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাচ্ছে।

খোলাবাজারেও এলপিজির প্রাপ্যতা কমেছে। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি সীমিত বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
বিইআরসি যে দামে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করে, তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দামের বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কমিশন আগে প্রতি টন এলপিজির আমদানি মূল্য ১৬০ ডলার ধরে দাম নির্ধারণ করলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তা ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারের মধ্যে উঠেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে সীমিত পরিমাণে গ্যাস বিতরণ করতে হচ্ছে।

মেঘনা ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় পরিমাণ এলপিজি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু সরবরাহ বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে। এ ছাড়া পরিবহন ও শিল্প খাতেও এলপিজির ব্যবহার রয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।

বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা করা হয়েছিল। তবে বাজারে ভোক্তাদের ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দা জানান, এক সপ্তাহ আগে পাশের বাসার একজন ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৫০ টাকায় কিনেছিলেন। কয়েক দিন পর একই ধরনের সিলিন্ডার তাঁকে কিনতে হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকায়।

এর আগে গত ডিসেম্বরে দেশে এলপিজির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর সরকার নিজে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয়।

গত ২০ জানুয়ারি তিনটি শর্তে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) এলপিজি আমদানির অনুমতি দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কয়েক দফায় সরবরাহকারী খোঁজা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি। পরে আগস্টে স্পিড মার্কেটিং ৫ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ জানালে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়া হয়। তবে সেই এলপিজি কবে দেশে আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এদিকে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক বলেছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সংকট আরও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, সরকার আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে।
অন্যদিকে বাজারে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে। তবে অভিযানের ভয়ে কোনো কোনো খুচরা বিক্রেতা দোকান বন্ধ রাখছেন বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। এতে বাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, কয়েক দিন ধরে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংকটের সময় খুচরা বিক্রেতারা দোকান বন্ধ করে দিলে সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। আমদানি আপাতত চললেও তা অব্যাহত রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি, আমদানি কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের এলপিজি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনে ভোক্তাদের আরও বেশি দামে এলপিজি কিনতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share This Article
Leave a Comment