ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ঢোল আর মাদলের তালে তালে নাচছেন নারী-পুরুষ। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শিশু-কিশোরেরাও। রঙিন পোশাকে সেজে সবাই মেতে উঠেছেন আনন্দে। কারাম গাছের ডালকে ঘিরে চলছে নানা আনুষ্ঠানিকতা। একপর্যায়ে উৎসবস্থল পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভালো ফসলের প্রত্যাশায় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের পাঁচপীরডাঙ্গা গ্রামে গত শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ওরাঁও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব।
রাত নয়টার দিকে শুরু হয় উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। কয়েক দিন আগে থেকেই এ আয়োজনকে ঘিরে গ্রামটিতে তৈরি হয়েছিল উৎসবের আমেজ। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেকে এসেছিলেন উৎসব দেখতে।
কারাম পূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা হলো কারাম গাছের ডাল সংগ্রহ করে তা পূজার বেদিতে স্থাপন করা। এ উপলক্ষে ওরাঁও নারীরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করেন। পরে নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের তালে কারাম গাছের ডাল সংগ্রহ করে স্থাপন করা হয় পূজার বেদিতে।
পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ কেরকেটা বলেন, বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি, ভালো ফসল ও সুখ-সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় প্রতিবছর কারাম পূজার আয়োজন করা হয়।
ঐতিহ্য ধরে রাখছেন নারীরা
কারাম উৎসব ওরাঁও সম্প্রদায়ের নারীদের কাছে শুধু পূজার আয়োজন নয়, নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করারও একটি উপলক্ষ। উপবাস পালন, পূজার আনুষ্ঠানিকতা এবং নাচ-গানে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা এ উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
ঢোল ও মাদলের তালে তালে নারী-পুরুষের নাচ-গানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। শিশু-কিশোরেরাও যোগ দেয় সেই আনন্দে। একসঙ্গে উৎসব উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় মিলনমেলার পরিবেশ।
নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ
আধুনিকতার ব্যস্ততায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে পাঁচপীরডাঙ্গার কারাম উৎসবে বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে নিজেদের সংস্কৃতি চর্চার ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কারাম উৎসব হয়ে উঠেছে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার একটি উপলক্ষ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও এ আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
উৎসব ঘিরে সম্প্রীতির বন্ধন
ঠাকুরগাঁওয়ের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকেও দর্শনার্থীরা এসেছিলেন এ উৎসবে। তাঁরা উপভোগ করেন ওরাঁও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানসহ নানা আয়োজন।
উৎসবে আসা অতিথিরাও এ আয়োজনের প্রশংসা করেন। ওরাঁও সম্প্রদায়ের জীবনমানের উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফ ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. ইমরান হোসেন চৌধুরী বলেন, একটি কারাম গাছের ডালকে কেন্দ্র করে উৎসবের সূচনা হলেও পরে তা মিলনমেলায় পরিণত হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওরাঁও সম্প্রদায়ের মানুষ এ আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
তিনি বলেন, কারাম উৎসব তাঁদের কাছে শুধু পূজা নয়; এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ ও সম্প্রীতির প্রকাশ। এ আয়োজন আরও বড় পরিসরে করতে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তিন দিনের আয়োজন
আয়োজকেরা জানান, কারাম উৎসব মূলত তিন দিনের আয়োজন। ভাদ্র মাসের শেষ এবং আশ্বিন মাসের শুরুর দিকে এ উৎসব পালন করা হয়।
শুক্রবার রাতে মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার সকালে কারাম গাছের ডাল নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার কথা।
উৎসবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফ, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. ইমরান হোসেন চৌধুরী, পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ কেরকেটাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এ সময় ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান তানুসহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

