কোরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি চায় দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তরকে সংলাপের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
4 Min Read
ছবি : দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংরয়টার্স

বিশ্ব ডেস্ক

কোরীয় উপদ্বীপে দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে উত্তর কোরিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে–মিউং। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে সংঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে।

শনিবার জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কোরিয়ার স্বাধীনতা লাভের বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে লি জে–মিউং এসব কথা বলেন। তিনি কেবল উত্তেজনা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেননি, ১৯৫০–৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে উত্তর কোরিয়া ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ শুরুর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন।

১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে কোরীয় যুদ্ধের সরাসরি লড়াই থেমে যায়। কিন্তু এরপর আর কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে সাত দশকের বেশি সময় পরও দুই কোরিয়া কার্যত যুদ্ধবিরতির অবস্থায় রয়েছে।

লি জে–মিউং বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কাঠামোর পরিবর্তে কোরীয় উপদ্বীপে একটি স্থায়ী শান্তিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সংলাপের পরিবেশ তৈরি হলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ও সক্ষমতা সীমিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও বাস্তবসম্মত আলোচনা করা সম্ভব হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট আরও জানান, উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত ঠেকাতে সিউল প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করবে। পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক স্তরের প্রতিরোধ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর রাখার কথাও বলেন তিনি।

তবে সিউলের এই উদ্যোগের বিপরীতে পিয়ংইয়ংয়ের অবস্থান এখনো কঠোর। উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাণের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকেও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছে উত্তর কোরিয়া। পিয়ংইয়ংয়ের অভিযোগ, এসব সামরিক তৎপরতা কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

যুদ্ধের শুরু যেভাবে

কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান বিভাজনের পেছনে সবচেয়ে বড় ঘটনা ১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধ। ওই বছরের ২৫ জুন ভোরে উত্তর কোরিয়ার বাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ার ভূখণ্ডে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। কামান, ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান নিয়ে দ্রুত দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয় তারা।

শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাহিনী আক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল না। ফলে উত্তর কোরিয়ার সেনারা দ্রুত অগ্রসর হয়ে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে রাজধানী সিউল দখল করে নেয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বুসানকে অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করে।

পরবর্তী সময়ে সংঘাতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ তিন বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পর কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি না হওয়ায় কাগজে-কলমে যুদ্ধের সমাপ্তি আজও হয়নি।

এখনো মুখোমুখি দুই কোরিয়া

বর্তমানে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে প্রায় ১৬০ মাইল দীর্ঘ ডিমিলিটারাইজড জোন বা অসামরিকীকৃত এলাকা রয়েছে। নামের মধ্যে ‘অসামরিকীকৃত’ থাকলেও অঞ্চলটি বিশ্বের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক সীমান্তগুলোর একটি। সীমান্তের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি, দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে লি জে–মিউংয়ের সংলাপের আহ্বান নতুন করে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তবে সাত দশকের বেশি সময়ের অবিশ্বাস ও সামরিক উত্তেজনার পর দুই দেশের মধ্যে সত্যিকারের শান্তি ফিরিয়ে আনতে শুধু প্রস্তাব নয়, প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক আস্থার।

Share This Article
Leave a Comment