৮ দফা দাবিতে তপ্ত রোদে শিক্ষার্থীর অবস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক
6 Min Read
ছবি: ৮ দফা দাবিতে তপ্ত রোদে শিক্ষার্থী হাসিবুলের অবস্থান

৮ দফা দাবিতে তপ্ত রোদে শিক্ষার্থীর অবস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারসহ আট দফা দাবিতে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসিবুল হোসেন শান্ত। আজ মঙ্গলবার তৃতীয় দিনের মতো তপ্ত রোদের মধ্যে একাই অবস্থান করতে দেখা যায় তাঁকে।

সকাল ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে ছাতা মাথায় নিয়ে বসে ছিলেন হাসিবুল হোসেন। তাঁর হাতে ও আশপাশে আট দফা দাবিসংবলিত বিভিন্ন লেখা দেখা যায়।

হাসিবুল হোসেন বলেন, ‘আমরা দুই বছর ধরে আন্দোলনের মধ্যে আছি। এখন হয় বাঁচব, নয়তো এই দাবি বাস্তবায়ন হবে।’

জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন আন্দোলনের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—সংস্কার কমিশন গঠন করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি আইন অনুযায়ী নির্ধারণ, রিটেক ফি মূল কোর্স ফির অর্ধেক করা এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-বাণিজ্য বন্ধ করা।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, শিক্ষার মান ও কার্যক্রম বিবেচনায় সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন এবং গত দুই বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবিও রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে শিক্ষার্থী হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত, তিন শিক্ষার্থীকে সাসপেন্ড করার ঘটনায় উপাচার্যের পদত্যাগ এবং ওয়াই-ফাই, ক্যান্টিন ও গ্রেডিংসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান।

হাসিবুল হোসেন শান্ত বলেন, জুলাই আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায় দেশের বিভিন্ন সমস্যা, দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত করে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ১২টি বিষয়ও তখন চিহ্নিত করা হয়।

তাঁর ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে নাহিদদের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা হলেও কর্মকৌশল নিয়ে মতের মিল না হওয়ায় তাঁরা আলাদা হয়ে যান। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার দৃশ্যমান অগ্রগতি তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির বিষয়ে হাসিবুল বলেন, আইন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ব্যয় হয়, তার ভিত্তিতে টিউশন ফি নির্ধারণের কথা। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ফি নেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। রাষ্ট্রের পক্ষে সব শিক্ষার্থীর শিক্ষার ব্যয় বহন করা সম্ভব নয় বলেই এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিন্তু আইন মেনে টিউশন ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে হাসিবুল বলেন, জুলাইয়ের পর তাঁরা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্বে আসেন। এরপর টিউশন ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে টিউশন ফি কমানোর দাবি ছিল।

হাসিবুলের দাবি, গত ২৫ নভেম্বর তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়েছিল। সেখানে তিনি প্রতি ক্রেডিটের টিউশন ফি ৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু জানুয়ারি থেকে প্রতি ক্রেডিটের ফি ৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। তাঁর মতে, প্রতি ক্রেডিট ৬ হাজার ৫০০ টাকা নিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও লাভ করা সম্ভব। তবে অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিন শিক্ষার্থীকে সাসপেন্ড করার বিষয়ে হাসিবুল বলেন, ১১ ডিসেম্বরের একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁকেসহ তিন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোড অব কন্ডাক্ট ও নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ আনা হলেও তা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।

হাসিবুল বলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষার্থী প্ল্যাটফর্মের অ্যাডমিন ছিলেন। ওই প্ল্যাটফর্মে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু লেখা হয়েছিল। এর দায় তাঁর ওপর দিয়ে তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়। তবে অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলে তাঁর দাবি।

এ বিষয়ে গত ২৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) লিখিত আবেদন করেছিলেন বলে জানান হাসিবুল। তাঁর ভাষ্য, প্রায় আট মাস পার হলেও বিষয়টির কোনো সমাধান হয়নি। ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি দিলেও তার জবাব দেওয়া হয়নি। এরপরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

টিউশন ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে অবৈধ দাবি করে গত ২১ জুলাই আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠানোর কথাও জানান হাসিবুল। এতে সমাধান না হওয়ায় ৯ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করা হয়। পরে আদালত রুল জারি করে সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চান, টিউশন ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হলেও এখনো কোনো জবাব দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

হাসিবুল বলেন, ‘অন্যায় এখনো চলমান। আমরা নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ চাই।’ এ দাবিতে ৭ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিন দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাঁরা অবস্থান কর্মসূচিতে বসেছেন।

কতদিন এ কর্মসূচি চলবে জানতে চাইলে হাসিবুল বলেন, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত এবং আন্দোলনের বিষয়ে অবগত অনেকেই সরকারের পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন। গত আট থেকে নয় মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও তাঁরা সমাধান পাননি।

একপর্যায়ে নিজের জীবন নিয়েও শঙ্কার কথা জানান হাসিবুল। তিনি বলেন, ‘হয়তো বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে, যার মাধ্যমে দাবি বাস্তবায়ন হবে। হয়তো আমি বেঁচে নাও থাকতে পারি। কারণ এই অন্যায় মেনে নিয়ে চুপ থাকার কোনো মানে নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের পরিবর্তনের জন্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা দুই বছর ধরে আন্দোলনের মধ্যে আছি। এখন হয় বাঁচব, নয়তো এই দাবি বাস্তবায়ন হবে।’

Share This Article
Leave a Comment