লাইফস্টাইল ডেস্ক: শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে অনেকেই খাদ্যতালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার বাড়িয়ে দেন। মাংস, মাছ, ডাল, শাকসবজি, বাদাম ও বীজ নিয়মিত খাওয়ার পরও কারও কারও শরীরে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক হয় না। এর পেছনে শুধু খাবারে আয়রনের পরিমাণ কম থাকাই দায়ী নয়। শরীর কতটা আয়রন শোষণ করছে, কতটা ব্যবহার করছে এবং কোনো কারণে শরীর থেকে আয়রন বেশি বেরিয়ে যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
আয়রন শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হিমোগ্লোবিন লোহিত রক্তকণিকার এমন একটি প্রোটিন, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। শরীরে আয়রনের মজুত দীর্ঘদিন কমে গেলে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এতে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
শরীর হয়তো খাবার থেকে আয়রন শোষণ করতে পারছে না
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেলেই শরীর তার পুরোটা শোষণ করতে পারে না। আয়রনের ধরনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মাংস ও মাছ থেকে পাওয়া হিম আয়রন তুলনামূলকভাবে সহজে শোষিত হয়। অন্যদিকে ডাল, শিম, বাদাম, বীজ ও শাকসবজিতে থাকা নন-হিম আয়রন শরীরে শোষিত হওয়ার হার তুলনামূলক কম।
খাবারের সঙ্গে চা বা কফি পান করলে আয়রন শোষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করলেও শোষণে প্রভাব পড়তে পারে।
উদ্ভিদজাত খাবার থেকেই যদি বেশি আয়রন নেওয়া হয়, তাহলে একই খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী। লেবুজাতীয় ফল, টমেটো, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি নন-হিম আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে।
রক্তক্ষরণ হলেও কমতে পারে আয়রন
শরীর থেকে নিয়মিত বা অতিরিক্ত রক্ত বেরিয়ে গেলে আয়রনের মজুত কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব নারীর অতিরিক্ত মাসিক হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন থাকলেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
মাসিক সাত দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া, ঘন ঘন প্যাড পরিবর্তনের প্রয়োজন হওয়া, বড় আকারের রক্তের জমাট বের হওয়া কিংবা অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হওয়া—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
এ ছাড়া পাকস্থলী বা অন্ত্রে রক্তক্ষরণ থেকেও আয়রনের ঘাটতি হতে পারে। আলসার, পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহ, অর্শ এবং কিছু ধরনের প্রদাহরোধী ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহারের সঙ্গে এমন রক্তক্ষরণের সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষ করে পুরুষ কিংবা মেনোপজের পর নারীর শরীরে কারণ না জানা আয়রনের ঘাটতি থাকলে শুধু খাবারের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অন্ত্রের সমস্যায় কমতে পারে পুষ্টি শোষণ
শরীরে খাবার থেকে আয়রনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণে অন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই অন্ত্রের কোনো সমস্যা থাকলে পর্যাপ্ত আয়রন গ্রহণ করেও ঘাটতি পূরণ নাও হতে পারে।
সিলিয়াক ডিজিজের মতো কিছু রোগ ক্ষুদ্রান্ত্রের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে খাবার থেকে বিভিন্ন পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা কমে যায় এবং আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সিলিয়াক ডিজিজের ক্ষেত্রে সব সময় স্পষ্ট হজমের সমস্যা দেখা নাও দিতে পারে।
এ ছাড়া অন্ত্রের অন্যান্য রোগ কিংবা পাকস্থলীতে কিছু ধরনের অস্ত্রোপচারের পরও আয়রন শোষণে সমস্যা হতে পারে।
কিছু সময়ে শরীরের আয়রনের চাহিদা বেড়ে যায়
সব সময় কম আয়রন গ্রহণ করলেই ঘাটতি হয়—বিষয়টি এমন নয়। জীবনের কিছু পর্যায়ে শরীরে আয়রনের প্রয়োজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।
গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে বাড়তি রক্ত তৈরি এবং গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বেশি আয়রন প্রয়োজন হয়। একইভাবে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের দ্রুত বেড়ে ওঠার সময়ও আয়রনের চাহিদা বাড়তে পারে।
তাই স্বাভাবিকভাবে ভালো খাদ্যাভ্যাস থাকলেও এসব সময়ে শরীরের বাড়তি চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
খাবারে আয়রন থাকলেই তা পুরোপুরি শরীরে কাজে লাগে না
কোনো খাবারকে আয়রনসমৃদ্ধ বলা হলেও সেই খাবারের সব আয়রন শরীর ব্যবহার করতে পারে না। বিশেষ করে উদ্ভিদজাত খাবারের নন-হিম আয়রনের শোষণ ব্যক্তিভেদে এবং খাবারের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই শুধু একটি-দুটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত ডাল, শিম, আয়রনসমৃদ্ধ শস্য, বাদাম, বীজ ও শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখা ভালো। একই সঙ্গে এসব খাবার কীভাবে ও কোন খাবারের সঙ্গে খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যাও কারণ হতে পারে
কখনো আয়রনের ঘাটতির পেছনে অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, কিডনি রোগসহ কিছু অসুস্থতা শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি ও আয়রন ব্যবহারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরও যদি আয়রনের মাত্রা বা হিমোগ্লোবিন কম থাকে, তাহলে শুধু খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ঘাটতির কারণ খুঁজে বের করা উচিত।
মনে রাখা দরকার, আয়রনের ঘাটতি দীর্ঘদিন থাকলে এর কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন আয়রনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

